বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

প্রকৃতিপূজা

সবলের অত্যাচারে দুর্ব্বল ব্যক্তি জীর্ণ শীর্ণ অবসন্ন হইয়া সমাজের প্রান্তদেশে লুক্কায়িত থাকিতেছে, কেহ তাহার মুখের পানে চাহিয়া করুণার দৃষ্টি নিক্ষেপ আবশ্যক বোধ করিতেছে না, ইহা সত্য কথা। অগত্যা দুর্ব্বল আত্মরক্ষার জন্য সবলের উপাসনায় বাধ্য হয়। 

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

 

মানুষ মানুষের সহিত যুঝিয়া আসিতেছে ও মানুষ প্রকৃতির সহিত যুঝিয়া আসিতেছে। অতি পুরাকাল হইতে এই সংগ্রামের আরম্ভ হইয়াছে; অদ্যাপি এই সংগ্রামের পর্য্যবসান হয় নাই। ভবিষ্যতে কবে এই সংগ্রামের পর্য্যবসান হইবে, তাহা বলা যায় না। 

প্রকৃতির সহিত মানুষের চিরন্তন মহাসমর চলিতেছে; মানুষ এই সমরে চিরকাল দলিত, পীড়িত ও বিক্ষত হইয়া ত্রাহিস্বরে ক্রন্দন করিতেছে। কিন্তু তাহার প্রতিবেশী সমানধর্ম্মা মানুষের সহিতই যে তাহার তুল্যভাবে ঘোর সংগ্রাম চলিতেছে, বোধ করি কতকটা লজ্জার খাতিরে সে তাহা স্বীকার করিতে চায় না। 

কিন্তু কথাটা অতিশয় সত্য, এবং এই সত্য কথাকে ভিত্তিস্বরূপ করিয়া ইংরেজ দার্শনিক হব্‌স্‌ সমাজতত্ত্ব ও রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। হবসের মতে রাষ্ট্রভুক্ত প্রত্যেক মনুষ্য অপর মনুষ্যকে আক্রমণের ও বিনাশের জন্য সর্ব্বদা প্রস্তুত রহিয়াছে। রাষ্ট্রমধ্যে শান্তিরক্ষার জন্য অপ্রতিহত প্রভাব ও নিষ্করুণ রাজশক্তি বর্ত্তমান না থাকিলে এতদিন সকলে নখানখি ও দন্তাদন্তি করিয়া উচ্ছিন্ন হইত। 

ডারুইন সেদিন দেখাইয়াছেন, মানুষে মানুষের এইরূপ ভীষণ বিসংবাদ চলিতেছে সত্য বটে, তবে তজ্জন্য মনুষ্যচরিত্রকে সর্ব্বতোভাবে দায়ী করা যায় না। এ বিষয়ে মনুষ্য প্রকৃতির হাতে ক্রীড়াপুতুল। জীবনরক্ষার জন্য একটা প্রচণ্ড স্পৃহা মনুষ্যের অন্তঃকরণে প্রকৃতি ঠাকুরাণী নিহিত করিয়াছেন এবং অন্নকেই সেই জীবনরক্ষার একমাত্র উপায় বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু বৎসর বৎসর যতগুলি মানবশিশু ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়া থাকে, তাহাদের সকলের অন্নসংস্থানের কোনরূপ ব্যবস্থা হয় নাই। মানুষে কি করে; জীবনরক্ষার্থে সেই মুষ্টিমেয় খাদ্যসামগ্রী লইয়া কাড়াকাড়ি করিতে থাকে। ইহাতে তাহার দোষ কি? 

দোষ থাক্‌ আর নাই থাক্‌, মনুষ্যসমাজের অভ্যন্তরে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেই এইরূপ একটা নিষ্ঠুর নিষ্করুণ বিসংবাদ যে সর্ব্বদা চলিতেছে, তাহা দেখা যায়। সবলের অত্যাচারে দুর্ব্বল ব্যক্তি জীর্ণ শীর্ণ অবসন্ন হইয়া সমাজের প্রান্তদেশে লুক্কায়িত থাকিতেছে, কেহ তাহার মুখের পানে চাহিয়া করুণার দৃষ্টি নিক্ষেপ আবশ্যক বোধ করিতেছে না, ইহা সত্য কথা। অগত্যা দুর্ব্বল আত্মরক্ষার জন্য সবলের উপাসনায় বাধ্য হয়। 

মানুষের উপর প্রকৃতির অত্যাচার অধিক কি মানুষের অত্যাচার অধিক, বলা কঠিন। 

সবল প্রকৃতির পীড়নে দুর্ব্বল মানুষ চিরদিন পীড়িত; এবং সবল মানুষের পীড়নে দুর্ব্বল মানুষ চিরদিন ধরিয়া ততোধিক নিগৃহীত। আত্মরক্ষার জন্য দুর্ব্বলের উভয়ত্র একমাত্র পন্থা সবলের উপাসনা। মনুষ্যের উপাসনা এ প্রস্তাবের বিষয় নহে। প্রকৃতির উপাসনা বর্ত্তমান প্রসঙ্গের আলোচ্য।

সর্ব্বদেশে সর্ব্বকালে মানব প্রকৃতিপূজায় নিযুক্ত। এই প্রকৃতিপূজার উৎপত্তি কিরূপে হইল, তাহা নির্ণয়ে প্রবৃত্ত হইয়া নানা পণ্ডিতে নানা কথা কহিয়াছেন। মোক্ষমূলরের সিদ্ধান্ত একরকম; হর্বার্ট স্পেন্সারের সিদ্ধান্ত অন্যরূপ। অন্য পণ্ডিতে অন্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। সেই সকল বিচারে আমা প্রবৃত্ত হইব না। মানুষ আপনাকে জড় জগতের অধীন বলিয়া ভাবে। জড় জগৎ তাহার প্রভু; মানুষ তাহার দাস। প্রভুর ক্ষমতার সীমানা নাই; প্রভুর খেয়াল নিরঙ্কুশসে ক্ষেত্রে উপাসনাই শ্রেয়ঃকল্প। 

অব্যবস্থিতচিত্ততায় প্রকৃতির সহিত কোন প্রভু তুলনীয় নহে। কখন কিরূপ খেয়াল থাকিবে, হিসাব করিয়া গণনা চলে না। তাই সর্ব্বত্র উপাসনাই শ্রেয়ঃকল্প। 

সুতরাং প্রকৃতিতে যাহা কিছু প্রবল ও শক্তিশালী বলিয়া বোধ কর, তাহারই উপাসনা কর। সূর্য্যের পূজা কর, চন্দ্রের পূজা কর, মেঘের পূজা কর, বায়ুর, জলের, আগুনের সকলেরই পূজা কর। বৃক্ষ পর্ব্বত নদী সমুদ্র, কেহই যেন ফাঁক না যায়। কাহার মনে কি আছে কে বলিতে পারে? কাহার শক্তি কিরূপ তাহা কে জানে? যাহাকে সম্মুখে দেখ, তাহারই উপাসনা কর। সাপ, বাঘ, বিড়াল, কুকুর, ইট, পাথর, কেহ যেন বাদ না পড়ে। সাবধান ব্যক্তি কড়াক্রান্তি হিসাব করিয়া চলেন; কেহ যেন বাদ না পড়ে। ব্রহ্মাণ্ডময় দেবতা প্রতিষ্ঠা কর। শস্যশালিনী পৃথিবী অখিল ভূতের জননীস্বরূপা; তাঁহার পূজা কর। ঊর্ধ্ব হইতে আকাশ পৃথ্বীকে আলিঙ্গন করিয়া রহিয়াছেন; তিনি পরম পিতা; তাহার পূজা কর। দেবতার সংখ্যা কত, কে জানে? তিন, কি তেত্রিশ, কি তেত্রিশ কোটি, কে বলিতে পারে? প্রত্যক্ষে না পোষায়, কল্পনার আশ্রয় লও। 

জগতের কাণ্ডকারখানা সবই অপূর্ব্ব। কোথা হইতে কি হয়, মানুষের জ্ঞানের বহির্ভূত, মানুষের গণনার অতীত। সূর্য্যদেব কোথা হইতে একচক্র রথে হরিদশ্ব যোজিত করিয়া অরুণ সারথিকে পুরোবর্ত্তী করিয়া জগতের তিমিররাশি ভেদ করিতে উপস্থিত হয়েন; অগ্রে চারুহাসিনী ঊষা বনের ফুল ফুটাইয়া, মন্দমারুতে বনস্থল প্রকম্পিত করিয়া সুপ্ত জীবকুলকে প্রবোধিত করেন। এই বা কি অদ্ভুত! নৃত্যপরা ঊষাসুন্দরী বর্ণকান্তিতে দিঙ্‌মণ্ডল আলো করিয়া চঞ্চলচরণে উপস্থিত হইতেছেন; উঠ উঠ, সুপ্ত মানব অর্ঘ্যপাত্র হাতে লইয়া তাঁহার অভ্যর্থনা কর; তাঁহার চরণতলে শতদল ফুটিয়া উঠিতেছে, তাঁহার নিশ্বাসসৌরভে দশদিক্‌ আমোদিত হইতেছে; তাঁহার অনাবৃত বক্ষোদেশ হইতে ক্ষীরধারা নিঃসৃত হইতেছে। দেখ, হরিদশ্ব রথে আরোহণ করিয়া ঊষাদেবীর রূপরাগে আকৃষ্ট হইয়া দিবাকর তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন; সমুদয় আকাশমার্গ অতিক্রম করিয়া জ্যোতিঃপ্রভায় দিগন্ত আলোকিত করিয়া চলিলেন। পশ্চিমাকাশে যখন সন্ধ্যার রক্তিমরাগে জগৎ নূতন বেশ ধারণ করিয়াছে, তখন দিবাকর ঊষার সহিত সঙ্গত হইলেন। সন্ধ্যা ত ঊষারই অন্য মূর্ত্তি! কিন্তু হায় কি হইল! ঊষা যে দিবাকরের দুহিতা। দিবাকর প্রজাপতি; কিন্তু ঊষাদেবী যে তাঁহার দুহিতা। প্রজাপতি ঋষ্যরূপ ধারণ করিয়া রোহিতরূপিণী রক্তবর্ণা ঊষাদেবীর সহিত সঙ্গত হইলেন। দেবগণ লজ্জায় মুখ লুকাইলেন। জগত অন্ধকার ডুবিল, ব্রহ্মাণ্ড আঁধারে মুখ লুকাইল। পরে কেবল আঁধার আর আঁধার। কোথা সেই শোভা, কোথা সেই বৈচিত্র্য! পরিণাম বিরস; হরিষে বিষাদ। সবিতা ঊষাদেবীর অন্বেষণে চলিয়াছেন। ত্রেতাযুগে ক্ষত্রিয় বীর সীতাদেবীর অন্বেষণে চলিয়াছিলেন। হেলেনিক বীরগণ সাগরপারে হেলেনাসুন্দরীর অন্বেষণে চলিয়াছিল। সর্ব্বত্র একই পরিণাম। দিবাকর পশ্চিমাকাশে দেবীর সহিত মিলিত হইলেন। ফুলশয্যা নির্মিত হইল। কিন্তু হায় সেই ফুলশয্যাই অন্তিমের মৃত্যুশয্যায় পরিণত হইবে কে জানিত! উহা সন্ধ্যা নহে; দিবাকরের চিতানল জ্বলিয়া উঠিয়া পৃথিবী আলোকিত করিয়াছে মাত্র; পরক্ষণেই বসুন্ধরা গভীর শ্বাস ফেলিয়া বিষাদের কালিমা ধারণ করিল। মহাবীর হীরাক্লীস বিজয়ান্তে প্রণয়িনীর নিকট আসিলেন। প্রণয়িনী তাঁহাকে অঙ্গরাখা কবচ পরিতে দিলেন। কে জানে সে কবচ প্রাণহন্তারক হইবে। মহাবীর কবচ পরিধান করিয়া চিতারোহণ করিলেন। ঈজীয় সাগরের পশ্চিম কূলে মহাবীরের চিতা জ্বলিল। সমুদ্রের জলরাশির উপরে গাঢ় অন্ধকার ভেদ করিয়া সেই চিতাবহ্নির রক্তরাগ পূর্ব্বকূল পর্য্যন্ত দীপ্ত করিল। বালডারের মৃতদেহ বহন করিয়া সমুদ্র বাহিয়া পশ্চিমমুখে তাঁহার নৌকাখানি চলিতেছে। নৌকার উপরে সজ্জিত চিতানলে বালডারের দেহখানি ধীরে ধীরে পুড়িতেছে। বালটিক সাগরের আঁধার পৃষ্ঠ সেই চিতালোকে দীপ্ত হইতেছে। রাবণের চিতা আজও নিবায় নাই। বালডারের চিতা কি নিবাইয়াছে? দুরন্ত শীতের মধ্যভাগে যখন পৃথিবীর উত্তরভাগ দিবালোকবর্জ্জিত হয়, ক্ষীণপ্রভ দিবাকর যখন দক্ষিণ আকাশে দেখা দেন বা দেখা দেন না, সেই সময়ে নোর্স জর্ম্মানেরা সেদিন পর্য্যন্ত বালডারের চিতা জ্বালিত। সে দিনও ঠিক্‌ সেই সময়ে খ্রীষ্টানেরা জ্যেহনের স্মরণার্থ সেই আগুন জ্বালাইত। অদ্যাপি যখন মার্ত্তণ্ড গ্রীষ্মঋতুর মাঝখানে দক্ষিণায়নগামী হয়েন তখন ইউরোপের লোকে সেই চিতার অনল জ্বালাইয়া থাকে। 

দিবাকর অস্ত গেলেন, আর কি ফিরিবেন না? বালডারের দেহ ভষ্মীভূত হইল, আর কি তিনি পুনর্জীবন পাইবেন না? পাগল! অমরের কি মৃত্যু আছে? দেব গিয়াছেন অধোভুবনে পাতালপুরে, পতিতের উদ্ধারের জন্য, মৃতের পুনর্জীবনের জন্য। আপোলো পাতালপুরে নামিয়াছিলেন, আলকেষ্টির উদ্ধারার্থ; দায়োনীসস্‌ নামিয়াছিলেন, জননীর উদ্ধারার্থ। থর অধোভুবন গিয়াছিলেন, ফিরিয়াছেন; ওধিন অধোভুবনে গিয়াছিলেন, ফিরিয়াছেন; খ্রীষ্ট নরক প্রবেশ করিয়াছিলেন, আশ্রিতগণকে তুলিয়া আনিবার জন্য। ভয় নাই, আপালো ফিরিয়াছিলেন; বালডারও ফিরিবেন।

মেশায়া আবার আসিবেন। কল্কিদেব আবার আসিয়া ভূভার হরণ করিবেন। বুদ্ধ গিয়েছেন, মৈত্রেয় আবার আসিবেন। জোহন বলিয়াছিলেন, আমার পরে তিনি আসবেন, আমার পূর্ব্বে তিনি স্থান পাইবেন। মহাবীর অদূসীয়স ত্রয়নগরে পরস্ত্রীহারকের দমনের জন্য গিয়াছেন। সকল বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া, মহাসাগর পার হইয়া, স্বদেশে তিনি ফিরিয়া আসিবেন। পেনিলপী, তোমার চিন্তা নাই; তোমার পাণিস্পর্শলোভী দুরাত্মাদিগের যথাকালে দমন হইবে। আর্থর কি মরিয়াছেন? পৃথিবীর প্রান্তদেশে আবালন দ্বীপে তিনি বাস করিতেছেন; সেখানে মর্ত্ত্যভূমির ঝঞ্ঝাবায়ু বহে না, সেখানে সারা বৎসর সমীরণ সুরভি বহন করে, সারা বৎসর সেখানে বসন্তের ফুল ফুটে। সময় হইলে আর্থর আবার ফিরিবেন। 

দিবাকর চিরতরে অস্ত যান নাই। কাল আবার ফিরিবেন। আবার তাঁহার মস্তকোপরি কনক মুকুট জ্বলিবে। আবার স্ফুরৎপ্রভামণ্ডলে তাঁহার শিরোদেশ শোভিত হইবে। আঁধার ও মেঘ ও কুজ্‌ঝটিকা তাঁহার উদয়ে বাধা দিবে; কিন্তু তীব্র করজালে বাধাবিপত্তি লঙ্ঘন করিয়া আকাশপথে হরিদশ্বরথে আরোহণ করিয়া দিগ্বিজয়ী বীরের ন্যায় তিনি চলিতে থাকিবেন। আকাশপটে কি দেখিতেছ? সিংহরাশির পর কন্যারাশি। কন্যারাশিতে দিবাকরের উদয়। মিশরবাসীগণ, প্রবুদ্ধ হও; আনন্দোৎসবে মত্ত হও; ভবিষ্যতের মানব তোমাদের অপেক্ষা করিয়া বসিয়া আছে। কন্যাগর্ভে দেবের উৎপত্তি। সিংহপৃষ্ঠে কন্যাকুমারী। তাঁহার গর্ভে দেবসেনাপতির উদ্ভব। কৃত্তিকাগণ তাঁহাকে স্তন্য দিয়া পালন করিবেন। সেনাপতি অসুর বধ করিবেন। দেবগণকে স্বপদে প্রতিষ্ঠিত করিবেন। কন্যাগর্ভে তনয়েশ্বরের জন্ম হইয়াছে। বেথলহীমে তারকার উদয় হইয়াছে। সপ্তর্ষি অর্ঘ্যহস্তে পূজা করিতে যাইতেছেন। শয়তান তাঁহাকে ভুলাইতে পারিবে না। খল সরীসৃপের মস্তকে তিনি পদাঘাত করিবেন। মায়াদেবীর অঙ্কে শিশু শাক্য শোভা পাইতেছেন। অসিতদেবল শাক্য শিশুর পূজা করিতে যাইতেছেন।  শিশু শাক্য বুদ্ধ হইবেন, জগৎকে প্রবোধিত করিবেন। মারবধূ তাঁহাকে প্রলোভিত করিতে পারিবে না।  দেবকীগর্ভে ভগবানের জন্ম হইয়াছে। যশোদা তাঁহার মুখগহ্বরে নিখিল ব্রহ্মাণ্ড দেখিলেন। গোপী তাঁহার ভজনা করে, গোপীর অভিলাষ তিনি পূর্ণ করেন। ধর্ম্মরাজ্য তাঁহাকে সংস্থাপন করিতে হইবে। ভূভার তাঁহাকে হরণ করিতে হইবে। 

মানবজাতি, উত্থান কর; দিবাকর উদিত হইয়াছেন; তিনি জগতের চক্ষুস্বরূপ; তিনি ধীশক্তির প্রেরণা করেন। তাঁহার উপাসনায় অগ্রসর হওঅদ্য ভাদ্রের কৃষ্ণাষ্টমী, সুখের শরতের আরম্ভ; গোকুলবাসী নন্দোৎসবে প্রবৃত্ত। অদ্য শরতের মহাষ্টমী; বর্ষাপগমে বসুধা নির্ম্মল মুখশ্রী ধরিয়া হাসিতেছে; মহাশক্তির বোধন হইয়াছে, প্রবুদ্ধশক্তির আরাধনা কর। অদ্য কোজগরী পূর্ণিমা; মহালক্ষ্মীর চরণক্ষেপে জগৎশতদল বিকশিত হইয়াছে; এমন রাতে কি ঘুমায়? নারিকেলোদক পান করিয়া অক্ষক্রীড়ায় আজ রাত্রি যাপন কর। অদ্য শারদোৎফুল্ল মল্লিকা কার্ত্তিকী পৌর্ণমাসী; বসুন্ধরা জ্যোৎস্নাবিধৌত শুভ্রবসন পরিধান করিয়া যৌবনরাগ বিকাশ করিয়া প্রিয়তমের প্রতি অভিসারে চলিয়াছে এবং প্রিয়সঙ্গমে রাস রসে হাসিতেছে ও তরল তরঙ্গে নাচিতেছে। অদ্য উত্তরায়ণসংক্রান্তি; হিমঋতু অবসানোন্মুখ; দেবগণের নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছে। নববর্ষের আগমন হইবে; মানবের উদ্ধারার্থ ঈশ্বর তাঁহার তনয়কে পাঠাইয়াছেন। অর্দ্ধ পৃথিবী আনন্দে উৎফুল্ল; ঘরে ঘরে আলো জ্বাল, সুরাপাত্রে মদিরা ঢাল। আজি বাসন্তী পঞ্চমী; মলয় বহিয়াছে, কুহুস্বর শোনা গিয়াছে, বাগ্বাদিনী বীণায় ঝঙ্কার দিয়াছেন, অর্দ্ধ ভূমণ্ডল সেই সঙ্গীতে মুগ্ধ হইতেছে। আজ আবার বাসন্তী পূর্ণিমা, মদনের মহোৎসবদিন। গোপীসখা সেই মহোৎসবে যোগ দিয়াছেন। আজি বহ্ন্যুৎসবের দিন; আকাশে খধূপ উৎক্ষেপণ কর। ফাগ কই, রঙ কই, নরনারী যে হোলিরঙ্গে মাতিয়াছে। 

দিনের পর রাত্রি; রাত্রির পর দিন। জন্ম হয় মৃত্যুর জন্য; কিন্তু মৃত্যু হয় আবার জন্মের জন্য। সৃষ্টির পর প্রলয়, প্রলয়ান্তে সৃষ্টি। মনুষ্য, চিন্তা করিও না; প্রকৃতির এই বিধান; প্রকৃতির উপাসনা কর। প্রকৃতি তোমাদের জননী; প্রকৃতিজননী তোমাদের জন্য আত্মোৎসর্গপরায়ণা। বিশ্বসৃষ্টি এক মহাযজ্ঞ। এই যজ্ঞে সহস্রশীর্ষা পুরুষ আত্মোৎসর্গ করিয়াছিলেন। দেবগণ তাঁহাকে পশু কল্পনা করিয়া সেই যজ্ঞে আহুতি দিয়াছিলেন। তাহার শীর্ষ হইতে দ্যুলোক, নাভি হইতে অন্তরিক্ষ, পদদ্বয় হইতে ভূমি, শ্রোত্র হইতে দিক্‌সকল উৎপন্ন হইয়াছিল। অদিতি হইতে দক্ষ জন্মিয়াছিলেন, দক্ষ হইতে অদিতি জন্মিয়াছিলেন। দক্ষকন্যা যজ্ঞে প্রাণ ত্যাগ করিয়াছিলেন। মহাদেব তাঁহার শবদেহ স্কন্ধে লইয়া পৃথিবী ভ্রমণ করিয়াছিলেন। তাঁহার ছিন্ন অঙ্গ পৃথিবী ব্যাপিয়া আছে। তিনি হৈমবতী উমারূপে পুনর্জন্ম লাভ করিয়াছিলেন। মানবের জন্য অসাইরিস তাইফনের হস্তে জীবন দিয়েছিলেন। তিনিও পুনর্জন্ম লাভ করিয়াছিলেন; ধর্ম্মের পুরস্কার, পাপের তিরস্কার, আজিও তাঁহার করায়ত্ত। আত্মোৎসর্গ বিনা যজ্ঞ হয় না; যজমান আপনাকে পশুরূপে উৎসর্গ করেন; যজ্ঞে তিনি আত্মনিস্ক্রয়স্বরূপে পশু বধ করেন। যজ্ঞের বধ বধ নহে। মানবের পাপপ্রক্ষালনের জন্য বলির প্রয়োজন। বিধাতা নিজ পুত্রকে বলিস্বরূপ ধরায় পাঠাইয়াছিলেন। তাঁহার রক্তে মানববংশ পবিত্র হইয়াছে; মানবের পাপরাশি ধুইয়া গিয়াছে। মৃত্যুর পর তিনি উঠিয়াছিলেন। শেষের সেই দিনে তিনি পিতার পার্শ্বে উপবিষ্ট হইয়া ধর্ম্মাধর্ম্মের বিচার করিবেন। অতএব বলিদানের আবশ্যকতা। শুনঃশেপের কাহিনী মনে আছে? আইফিজিনিয়ার কথা মনে আছে? জেফথা দুহিতার কথা কি মনে নাই? 

মরণের রহস্য সকলের উপর। মানুষ মরিয়া কোথায় যায়? জীয়ন্তে কি সেখানে যাওয়া যায় না? সে পুরী কোথায়? বৈতরণীর অপর পারে, বালটিক সাগরের অপর পারে। জাহ্নবীনীরে প্রিয়তমের ভস্মরাশি ভাসাইয়া দাও;  দেহখানি ভেলায় চাপাইয়া আগুন ধরাইয়া বালটিকের জলে ভাসাইয়া দাও। হয়ত সেই পুরীতে পৌঁছিতে পারে। 

শোভাময়ী শরৎ উদ্ভিন্নযৌবনা কুমারীর মত বনস্থলী আলো করিয়া বিচরণ করে। কোথা হইতে দারুণ শীত আসিয়া সুন্দরীকে হরণ করিয়া লইয়া যায়। জননী বসুন্ধরা কাঁদিতে থাকেন। জননী তাঁহার নন্দিনীর শোকে বিষাদের কুজ্‌ঝটিকায় মুখ ঢাকিয়া, সর্বত্র তাহাকে খুজিয়া বেড়ান। সুন্দরী পার্সিফনী সহচরীপরিবৃতা হইয়া বনে বনে ফুল তুলিয়া বেড়াইতেছিলেন। অকস্মাৎ ধরাতল বিদীর্ণ হইল। ভূগর্ভ হইতে কোন অদৃশ্য পুরুষের হস্ত উঠিয়া কুমারীকে হরণ করিয়া লইয়া গেল। সখীগণ হাহাকার করিয়া উঠিল। পৃথিবীমাতা হাহাকার করিতে লাগিলেন। সাক্ষী ছিলেন চন্দ্রমা, তাঁহার তমসাবৃত গুহার মধ্য হইতে; সাক্ষী ছিলেন সূর্য্য, তাঁহার সুদূর নির্জ্জন শিবিরাবাসে। জননী পৃথিবী কন্যা-শোকে জলে স্থলে কাননে আলো হাতে কাঁদিতে কাঁদিতে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। তাঁহারা উভয়ে সন্ধান দিলেন। অধোভুবনে দেবরাজ তাঁহার কন্যাকে লইয়া গিয়াছেন। জননী দীমীতীর ক্রোধ করিলেন। সংসার হইতে লক্ষ্মী অন্তর্দ্ধান করিলেন। গাছে আর ফুল হয় না; ভূমি আর শষ্য দেয় না; জীবকূল নিরানন্দ হইল। দেবরাজ ভীত হইলেন। মাতার হস্তে কন্যাকে প্রত্যর্পণ করিলেন। সেই অবধি বৎসরের মধ্যে আট মাস কন্যা মায়ের নিকট থাকে; চারি মাস অধোভুবনে দেবরাজের নিকট বাস করে। চারি মাস পৃথিবী শ্রীহারা হইয়া কাঁদে; আট মাস পৃথিবী শ্রীযুতা হইয়া হাসে। 

কাঁদিয়া কাঁদিয়া দীমীতীর কন্যা পাইয়াছিলেন। এমনি করিয়া দেবী আইসিস্‌ স্বামী অসাইরিস্‌কে পুনর্জীবন দান করিয়াছিলেন। সহজে কি তিনি স্বামী পাইয়াছিলেন? আইসিস্‌কেও তাঁহার অনুসন্ধানে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বেড়াইতে হইয়াছিল। সাবিত্রী সতীও সত্যবান্‌কে যমের হাত হইতে ফিরাইয়া আনেন; সেও কি সহজে?  তিনি ভর্ত্তৃবিনা সুখ প্রার্থনা করেন নাই, ভর্ত্তৃবিনা তিনি দ্যুলোক প্রার্থনা করেন নাই। ঋষির শাপে দেবগণ লক্ষ্মী হারাইয়াছিলেন। সমুদ্র মন্থন করিয়া দেবগণ তাঁহার উদ্ধার করেন। লক্ষ্মী অমৃতভাণ্ড হাতে লইয়া উঠিয়াছিলেন। অমৃতের সহিত হলাহলও উঠিয়াছিল।

বালডার মৃত্যুর পর কোথায় অবস্থান করিতেছেন? সহজে কি তিনি সেখান হইতে ফিরিবেন? যে যেখানে আছ, রোদন কর; বনের পশু, গাছের পাখি, তরুলতা, যে যেখানে আছ, রোদন কর। মাটি ফাটিয়া শোকাশ্রুর উৎস উঠিতেছে; বালডারের জন্য নির্জীব শিলা দ্রবীভূত হইতেছে। 

যাহাদিগকে ভালবাসিতাম, তাহারা কোথায় আছে, কে জানে? কোন্‌ আঁধার পুরে তাহারা বসতি করিতেছে; আঁধারে কি তাহারা পথ চিনিতে পারিবে? হাতে হাতে মশাল ধর। ঘরে ঘরে আলো জ্বাল। আজি কার্ত্তিকী অমাবস্যা; প্রিয়গণ গন্তব্য পথ চিনিতে পারিবে না; দীপমালায় অন্ধকার বিনষ্ট কর। গঙ্গাস্রোতে দীপগুলি ছাড়িয়া দাও। স্রোতে তাহাদিগকে ভাসাইয়া লইয়া যাক্‌। প্রেতপুরুষগণ তাহা ধরিয়া লইবেন। ব্যোমবহ্নি ঊর্দ্ধধমুখে ছাড়িয়া দাও। যমলোক ত্যাগ করিয়া যাঁহারা মহালয়ে আসিয়াছেন, তাঁহারা উজ্জ্বলজ্যোতি ব্যোমবহ্নির সাহায্যে পথ চিনিয়া লউন। 

শুধু শোক করিলে যে যায়, সে কি ফিরিয়া আসে? মৃত্যুর উপরে যে-রহস্যের আবরণ আছে, তাহা উন্মোচন করিতে হইবে। সে বড় দুর্ভেদ্য রহস্য। বুদ্ধিকে প্রদীপ্ত করিতে হইবে; তবে মরণতত্ত্ব জানিবে। যদি মরণতত্ত্ব জানিতে চাও; নিজে অমৃত পান কর। ঋষিগণ সোম পান করিয়া অমৃত লাভ করিয়াছিলেন। সোমলতা হইতে অমৃত নিষ্কাশন কর; দ্রাক্ষালতা হইতে অমৃতরস বাহির কর। গৌড়ী-পৈষ্টীও অভাবে চলিতে পারিবে। অমৃতপানে অমরত্ব লাভ করিবে, বুদ্ধি প্রদীপ্ত হইবে, আবরণ অপসৃত  হইবে, রহস্যের উদ্ভেদ হইবে। ইহার নাম গুপ্ত বিদ্যা; এই বিদ্যালাভে যথাবিধি দীক্ষা চাই। যে সে ইহাতে অধিকারী নহে।  দীক্ষিতের মধ্যে জাতিভেদ নাই; ভৈরবীচক্রে সকল বর্ণই দ্বিজোত্তম। সাবধান, অনধিকারী যেন এখানে প্রবেশলাভ না করে। পশু যেন বীরত্বের প্রয়াসী না হয়। 

শঙ্খঘণ্টা বাজাইয়া, ঢাকঢোল বাজাইয়া নৃত্যগীত-উৎসব হাসিকান্না দ্বারা দেবীর উপাসনা কর। ধুপধূনা জ্বালাও; পশুরক্তে নররক্তে মহীতল সিক্ত কর; তাহাতে দেবীর তৃপ্তি হইতে পারে। প্রাচীন ফিনিশিয়ায় দেবতার তর্পণ কিরূপে হইত? স্বয়ং এল দেব জগতের হিতের জন্য আপন পুত্রের কণ্ঠশোণিতে মহীতল সিক্ত করিয়াছিলেন। ফিনিকেরা তাহা জানিত; যখনই কোন দেবী অথবা মানুষী আপৎ আপতিত হইয়া স্বদেশের জন্য আশঙ্কা জন্মাইত, তখনই পিতা আপন পুত্র আনিয়া দিত, মাতা আপন কন্যা আনিয়া দিত। নরকণ্ঠনিঃসৃত তপ্তশোণিতে দেবীর তৃপ্তিসাধনের চেষ্টা হইত। কিন্তু তাহাতেও বুঝি মহাদেবীর তৃপ্তিলাভ ঘটিত না। তিনি অন্যবিধ বলি উপহার চাহিতেন। সে উপহার বীভৎস। 

গুপ্তবিদ্যায় যাঁহারা সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন, তাঁহারা মন্দিরের দ্বার অর্গলরুদ্ধ করিয়া অনধিকারীর চক্ষু হইতে সাধনাকে গুপ্ত রাখেন। সেই দ্বার উদ্‌ঘাটিত করিবার প্রয়োজন নাই। গুপ্ত সাধনা গুপ্ত থাকুক। ফিনিকেরা  এষ্টার্টির মন্দিরে যাহা অনুষ্ঠান করিত, সাইপ্রস্‌ দ্বীপের অধিষ্ঠাত্রী সাগরফেনোদ্ভবা আস্ফুজিৎ দেবীর উপাসনায় যাহা অনুষ্ঠিত হইত, পার্সিফনীর বিরহবিধুরা দীমীতীরের শোকবার্ত্তার স্মরণার্থ সমগ্র আথেন্স ইলিউসিসে সমবেত হইয়া অষ্টাহ ব্যাপিয়া যে অনুষ্ঠান করিত, বৌদ্ধবিহারমধ্যে আর্য্য তারা ও অনবদ্যাঙ্গী প্রজ্ঞাপারমিতার উপাসনার্থ সমবেত ভিক্ষুগণ ও ভিক্ষুণীগণ যে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিত, তাহা মানবের ইতিহাসে অতীত ঘটনা নহে। এখনও অন্তঃস্রোতস্বিনী ফল্গুধারার মত, নরসমাজে সেই স্রোত বহিয়া আসিতেছে; কবে তাহার গতি রুদ্ধ হইবে জানি না। তবে শুষ্ক বালুকা উৎখাত করিয়া সেই প্রবাহের আবিষ্কারের কোন প্রয়োজন নাই। প্রকৃতিরপূজার মন্দিরদ্বার অর্গলরুদ্ধ রহুক।

 

সাধনা, কার্তিক, ১৩০২

বানান অপরিবর্তিত

 

 

মতামত জানান

Your email address will not be published.