বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

মাতৃগুপ্ত

তাঁহার মন কতকটা নিরাশ হইল, কিন্তু তিনি এই ভাবিয়া আশ্বস্ত হইলেন যে, কর্ত্তব্যকর্ম্ম অবিচলিত ভাবে সাধন করলে যে আত্মতৃপ্তি লাভ হয়, তাহাই তাঁহার প্রাপ্য এবং তাহা হইতে কেহ তাঁহাকে বঞ্চিত করিতে পারিবে না।

দীনেশ্চন্দ্র সেন

 

পুরাকালে উজ্জয়নী নগরে হর্ষবিক্রমাদিত্য নামে এক প্রবল-পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন। তিনি শকদিগকে পরাজয় করাতে ‘শকারি বিক্রমাদিত্য’ নামেও পরিচিত হইয়া থাকেন। মহারাজ হর্ষের সভায় মাতৃগুপ্ত নামক তৎকালপ্রসিদ্ধ কবি উপস্থিত হইয়া রাজপ্রসাদাকাঙ্ক্ষী হইলেন। মাতৃগুপ্ত শুনিয়াছিলেন ভারতীয় আর কোন রাজা হর্ষের ন্যায় গুণবাণের আদর করিতে জানিতেন না। উজ্জয়িনীর রাজসভা পণ্ডিতমণ্ডলীর কাব্যালাপে নিত্য মুখরিত ছিল। রাজা সর্ব্বগুণের আধার, তাঁহার তোষামোদপ্রিয়তা ছিল না; কোন যোগ্য ব্যক্তি তাঁহার সভায় পুরস্কার হইতে বঞ্চিত হইত না এবং রাজা কখনই কোন কুমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করিতেন না। মাতৃগুপ্ত এইরূপ রাজসভার সংশ্রবে আসিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিলেন।
মাতৃগুপ্তের কবিত্বের যশঃ সেই সময় দেশময় ব্যপ্ত ছিল। তথাপি তিনি এরূপ নিরভিমান ও বিনীত ছিলেন যে, তিনি পণ্ডিতগণের সঙ্গে একত্র উপবেশন না করিয়া রাজাদেশপ্রতীক্ষায় সভার এক নিভৃত কোণে আসন গ্রহণ করিতেন। রাজা অল্প সময়ের মধ্যেই কবির বিবিধ গুণের একান্ত পক্ষপাতী হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি ভাল করিয়া পরীক্ষা করিবার অভিপ্রায়ে মাতৃগুপ্তের প্রতি আপাততঃ কোন অনুগ্রহ প্রদর্শন করিলেন না। দিনের পর দিন যাইতে লাগিল, মাতৃগুপ্ত সর্ব্বদা ছায়ার ন্যায় প্রভুর অনুগমন করিতে লাগিলেন। রাজপ্রসাদ না পাইয়া তিনি ক্ষুণ্ণ হইলেন না, প্রত্যহ তিনি অনাড়ম্বরে রাজাজ্ঞা প্রতিপালনপূর্ব্বক দীনভাবে তথায় অবস্থান করিতে লাগিলেন। রাজদ্বেষী নিন্দকগণের সঙ্গে তিনি ভ্রমেও আলাপ করিতেন না। কোন অশিষ্ট আলাপ শুনলে তিনি তথা হইতে উঠিয়া যাইতেন; রাজার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলিলে তিনি তাহা রাজার কর্ণে তুলিতেন না। তাঁহার অপুরস্কৃত, স্থির এবং অবিচলিত রাজভক্তিদর্শনে রাজভৃত্যগণ তাঁহাকে নানারূপ ঠাট্টা বিদ্রুপ করিত, কিন্তু তদ্দারা তিনি কিছু মাত্র বিচলিত হইতেন না। কোন ব্যক্তির গুণের পরিচয় পাইলে তিনি অকুণ্ঠত চিত্তে তাহার প্রশংসা করিতেন, এবং কোন প্রকার অনুগ্রহ না পাইয়াও কর্ত্তব্য কর্ম্মে কিঞ্চিন্মাত্র শিথিলতা প্রদর্শন করিতেন না।
একদা গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইবার সময় মাতৃগুপ্তের প্রতি রাজার দৃষ্টি নিপতিত হইল; অনাহারে কবির দেহ শীর্ণ হইয়াছিল, একখানি মলিন ও ছিন্ন বস্ত্রে তাঁহার অঙ্গ আবৃত ছিল, অথচ তৎপ্রতি তাঁহার দৃকপাত নাই; প্রভুর আদেশের জন্য তিনি স্থিরভাবে প্রতীক্ষা করিতেছেন। মাতৃগুপ্তের অবস্থা দেখিয়া রাজার চক্ষু অশ্রুপূর্ণ হইল, তিনি নিজকে ধিক্কার দিয়া ভাবিতে লাগিলেন,— এই পরম যোগ্য ব্যক্তিকে পরীক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে আমি কত না কষ্ট দিতেছি! শীতগ্রীষ্মে ইঁহার শরীর অনাবৃত, অনাহারে শরীর শীর্ণ, রোগ হইলে কে ইঁহাকে চিকিৎসা করে? আমি ইঁহার প্রতি কোন যত্ন প্রদর্শন করি নাই। অনুতপ্ত হৃদয়ে রাজা কবিকে পুরস্কৃত করিবার উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তৎকালে ভাবিয়া চিন্তিয়া কি পুরস্কার দিবেন, তাহা স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না। এইভাবে আরও ছয় মাস কাটিয়া গেল। তখন শীতকাল উপস্থিত হইয়াছে, উজ্জয়িনীর বিহগকুল শৈত্যাধিক্যে পক্ষপুট গুণ্ঠিত করিয়া বৃক্ষশাখায় নীরব হইয়া গিয়াছে। যব-গোধূমাচ্ছন্ন প্রান্তরবাহী, নদীনীরসিক্ত বায়ুপ্রবাহে নৈশ আকাশ ঈষৎ কম্পিত। উজ্জয়িনীর অধিবাসীরা নানারূপ উষ্ণ বস্ত্রে অঙ্গ আবৃত করিয়া দারুণ নৈশ বায়ু হইতে আত্মরক্ষা করিতেছে।

এইরূপে এক রাত্রিতে রাজা হর্ষদেবের নিদ্রাভঙ্গ হইয়া গেল, তখন তৈলাভাবে গৃহদীপ নির্ব্বাণোন্মুখ, রাজা তাঁহার প্রহরিগণকে সেই দীপে তৈলনিষেকের জন্য আহ্বান করিলেন, কিন্তু শৈত্যাদিক্যে প্রহরিগণ গাঢ় নিদ্রার বশবর্ত্তী হইয়াছিল। “বাহিরে কে আছ?” এই প্রশ্নের উত্তরে রাজা শুধু শুনিতে পাইলেন,— “আমি মাতৃগুপ্ত।” তখন আদেশপ্রাপ্ত হইয়া বিচিত্ররূপে সজ্জিত রাজার সুরম্য শয়নপ্রকোষ্ঠে মাতৃগুপ্ত প্রবেশ করিলেন, এবং তৈলনিষেকে দীপটি প্রজ্বলিত করিয়া দিলেন। “কত রাত্রি হইয়াছে” রাজা জিজ্ঞাসা করাতে মাতৃগুপ্ত বিনীতভাবে জানাইলেন, রাত্রি প্রভাতের আর এক প্রহর মাত্র বাকী আছে। রাজা বলিলেন,— “তুমি কিরূপে তাহা জানিলে? তুমি কি রাত্রিতে ঘুমাও নাই?” সুযোগ পাইয়া মাতৃগুপ্ত তখনই একটি কবিতা দ্বারা স্বীয় অবস্থা জ্ঞাপন করলেন— তাহার করুণ ছন্দঃ রাজার হৃদয় নিরতিশয় ব্যথিত করিল। তিনি তাঁহাকে কয়েকটি সান্ত্বনার কথা বলিয়া বিদায় দিলেন, কিন্তু তাঁহার যোগ্যতা ও অভাবের পরিচয় পাইয়াও এতদিন তাঁহার প্রতি কোনরূপ ব্যবস্থা করেন নাই, এই জন্য রাজার মনে তীব্র অনুতাপ উপস্থিত হইল।
এই সময়ে কাশ্মীর রাজসিংহাসন শূন্য ছিল, এবং কাশ্মীরবাসীরা মহারাজ হর্ষকে তথাকার রাজা নির্ব্বাচন করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন। রাজা মাতৃগুপ্তকেই এই পদের সর্ব্বতোভাবে যোগ্য মনে করিলেন এবং সেই রাত্রেই স্বয়ং উদ্যোগী হইয়া রাজদূত প্রেরণপূর্ব্বক কাশ্মীরে সংবাদ পাঠালেন যে, মাতৃগুপ্ত নামক জনৈক গুণবান্‌ পুরুষকে তিনি কাশ্মীরের রাজসিংহাসনের উপযুক্ত মনে করিয়াছেন। উক্ত মহাত্মা তাঁহার আদেশপত্র লইয়া উপস্থিত হইলে যেন তাঁহাকেই অভিষিক্ত করা হয়। আদেশপত্রখানিও সেই রাত্রেই প্রস্তুত করাইলেন এবং তৎপরে নিদ্রার্থ শয়নপ্রকোষ্ঠে পুনঃপ্রবেশ করিলেন।
এদিকে মাতৃগুপ্ত ভাবিলেন রাজা তাঁহার দুঃখমোচনের কোনই ব্যবস্থা করিলেন না। তাঁহার মন কতকটা নিরাশ হইল, কিন্তু তিনি এই ভাবিয়া আশ্বস্ত হইলেন যে, কর্ত্তব্যকর্ম্ম অবিচলিত ভাবে সাধন করলে যে আত্মতৃপ্তি লাভ হয়, তাহাই তাঁহার প্রাপ্য এবং তাহা হইতে কেহ তাঁহাকে বঞ্চিত করিতে পারিবে না। সময় হইলে ঈশ্বর আমাকে পুরস্কৃত করবেন, কিন্তু আমি তজ্জন্য প্রতীক্ষা করিয়া উপস্থিত কর্ত্তব্য অবহেলা করিব না। দুঃখের ভাবকে হৃদয়মধ্যে উপেক্ষা করিয়া কর্ত্তব্যনিষ্ঠ অধ্যবসায়ের সহিত পরদিন আবার তাঁহার কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন।
রাজসভা হইতে এই সময় দূত আসিয়া তাঁহাকে রাজসন্নিধানে লইয়া গেল। রাজা বিচারকবেশে সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন, তিনি মাতৃগুপ্তকে দেখিয়া সেই আদেশ-লিপিখানি তাঁহার হস্তে দিয়া বলিলেন, “তুমি এখনই কাশ্মীরাভিমুখে যাত্রা কর, কিন্তু সাবধান! এই পত্রখানি খুলিয়া পড়িও না, কাশ্মীররাজ্যের শাসনভারপ্রাপ্ত রাজকর্ম্মচারীর হস্তে এই পত্রখানি প্রদান করিও।”
চারিদিকে লোক কাণাকাণি করিতে লাগিল, রাজা মাতৃগুপ্তের প্রতি কোন সুবিচারই করিলেন না, এত কষ্ট দিয়াও রাজার ইঁহার প্রতি সদয় হইলেন না, এখন কি না অতি হীন পত্রবাহকের কার্য্যে ইঁহাকে নিযুক্ত করিলেন। ইঁহার এই অসামান্য পাণ্ডিত্য ও প্রভুভক্তির কোন পুরস্কারই হইল না।
মাতৃগুপ্ত সেই সকল সহানুভূতিব্যঞ্জক কথায় কর্ণপাত করিলেন না। যে সকল আদর ও প্রশংসায় লোকের বুদ্ধিভ্রংশ বা কর্ত্তব্যচ্যুতি ঘটিতে পারে, তাহা তিনি উপেক্ষা করিতেন। দৃঢ় সংকল্পারূঢ় কবি দীনবেশে কাশ্মীরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন।

কিয়ৎকাল পথ পর্য্যটন করিবার পর কাশ্মীরসীমায় সুদূরগগনাবলম্বী শ্বেতমেঘমালার ন্যায় হিমাদ্রিশিখর তাঁহার দৃষ্টিপথে পতিত হইল। কখনও বা শৈলশৃঙ্গ সূর্য্যকিরণে নানা বর্ণে উজ্জ্বল হইয়া দূরব্যাপী স্বর্ণকিরীটের শোভা ধারণপূর্ব্বক তাঁহার নেত্র রঞ্জন করিতে লাগিল; হিমালয়ের বিচিত্র উদ্ভিদসম্পদ নাট্যশালার দৃশ্যপটের ন্যায় তাঁহার সম্মুখে উদ্ভাসিত হইল এবং সুগন্ধ দেবদারুবাহিত নদীনীরসিক্ত বায়ুহিল্লোল তাঁহার উষ্ণীষের প্রান্তভাগ ঈষৎ কম্পিত করিতে লাগিল।
মাতৃগুপ্ত ক্রমাবর্ত্ত নামক স্থানে উপস্থিত হইয়া শুনিতে পাইলেন, কাশ্মীররাজ্যের প্রধান রাজকর্ম্মচারীগণ কি কারণে তথায় অবস্থান করিতেছেন। তিনি সেই স্থানে মলিন বস্ত্র পরিত্যাগ পূর্ব্বক শুক্লবস্ত্র পরিধান করিলেন এবং, তথাকার প্রধান রাজকর্ম্মচারীর নিকট উজ্জয়িনীরাজের আদেশলিপি প্রেরণ করিলেন। তখন বিচিত্র পরিচ্ছদ-ধারী প্রধান রাজকর্ম্মচারীরা তাঁহার অভ্যর্থনার জন্য উপস্থিত হইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার নামই কি মহাত্মা মাতৃগুপ্ত?”
মাতৃগুপ্তের পরিচয় পাইয়া তাঁহারা তাঁহাকে রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত করিবার প্রস্তাব জ্ঞাপন করিলেন। মাতৃগুপ্ত বুঝিলেন, পরমকারুণিক উজ্জয়িনীরাজ তাঁহার কথা ভুলিয়া যান নাই, স্বীয় সাম্রাজ্য হইতে রম্যতর রাজ্য তাঁহাকে প্রদান করিয়াছেন। কৃতজ্ঞতায় তাঁহার চক্ষু বারংবার অশ্রুপূর্ণ হইতে লাগিল।
রাজসিংহাসনে আসীন হইয়া প্রজাগণের জয়ধ্বনির সঙ্গে তিনি অভিষিক্ত হইলেন। রাজতরঙ্গিণীকার কহ্লন কবি লিখিয়াছেন— অভিষেকের জলধারা বিন্ধগাত্রে রেবাপ্রবাহের ন্যায় তাঁহার বক্ষোদেশ প্লাবিত করিয়াছিল। রাজা হইয়া তিনি মহারাজ হর্ষকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, অবিরল অশ্রুবিন্দুপাতে তাহার প্রতি ছত্র অভিষিক্ত হইয়াছিল।
মহারাজ মাতৃগুপ্ত কিঞ্চিন্ন্যূন পঞ্চবর্ষ কাল কাশ্মীররাজ্য সুশাসন করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজত্বকালে উক্ত রাজ্যের অশেষরূপ শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল। মহারাজ হর্ষবিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর সংবাদ পাইয়া ব্যথিত চিত্তে তিনি রাজপদ ত্যাগ করিলেন এবং যতিধর্ম্ম অবলম্বনপূর্ব্বক জীবনের অবশিষ্ট কাল কাশীতে বাস করিয়াছিলেন।
মাতৃগুপ্তের অবিচলিত কর্ত্তব্যবুদ্ধি ও অধ্যবসায়ের কাহিনী কাশ্মীর-ইতিহাসের একাংশ উজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে।

 

১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘সুকথা’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত। বানান অপরিবর্তিত।
মতামত জানান

Your email address will not be published.