বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

জীবন যখন উপন্যাসকে ছাপিয়ে যায়

দেশভাগের ঠিক আগে যে উপন্যাসের শুরু হয় তা সমাপ্ত হয় সানফ্রান্সিসকোর বুকে। এই দীর্ঘ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের সময়কালে ফিল্ম স্ট্রিপের মতো ভেসে আসে দেশের স্বাধীনতা, চিন-ভারত যুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, তার উগ্র হিংস্র প্রতিক্রিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি যাবতীয় ছবি।

সুদেব বসু

 

ক্যাপ্টেন স্কট, আমুন্ডসেনের মতো ইতিহাসবিশ্রুত অভিযাত্রী থেকে পশ্চিমবঙ্গের অধুনা শিখর বিজয়িনী পিয়ালী বসাক— এদের নিয়ে গর্ব করে আলোকিত হয় সমাজ, ধন্য হয় পৃথিবী। কিন্তু প্রতিনিয়ত কখনও দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে, কখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাঁরা শিল্প-বাণিজ্য-প্রযুক্তির চাকা সচল রেখে চলেছেন তাঁদের ক’জনের জীবনে সেই আলো পৌঁছয়? হ্যাঁ, সম্পন্ন জীবন বা সচ্ছলতা তাঁদেরও আসে। কিন্তু এক নিষ্ঠাবান কর্মী একমুহূর্তের জন্য যদি প্রশংসা পান, কাজের স্বীকৃতি পান, তাঁর কাছে সেটাই হয় পরিতৃপ্তির চরম পরাকাষ্ঠা। তেমনই একজন সুজিত মুখার্জি, যিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্বে অয়েল ট্যাঙ্কারে কাজ করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন যুদ্ধে। তবে যুদ্ধের বলি না হয়ে সহযোগীদের বিপন্মুক্ত করার কাহিনিকে তুলে ধরেছেন তাঁর বন্ধু, আমেরিকা প্রবাসী চিকিৎসক মদনগোপাল মুখোপাধ্যায়।

লেখাটিকে জীবনী উপন্যাস বলা যেতে পারে আবার নাও পারে। আসলে জীবন যখন বিস্তৃত হয়ে ওঠে, ঘটনার ঘনঘটার ভেতরে দিয়ে গিয়ে যখন তার উত্তরণ ঘটে তখন সেই জীবনের কাহিনি উপন্যাসের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। ‘আবর্ত’ উপন্যাসটি সেই গোত্রের।

সমাজের কিছু মানুষের জীবনাদর্শ হয় কর্ম, পরোপকার ও সাফল্য। সেই আদর্শেই সন্তানদের বড় করেছিলেন হেরম্বচন্দ্র মুখার্জি, নাগপুরে রেলের লোকো-শেডের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। যদিও কর্মচারীর সীমানা থেকে ব্রিটিশদের কাছে কৃতিত্বের পরিচয়ে তিনি স্বচ্ছন্দে পৌঁছে যান ‘সাহেব’-এর অভিধায়। কিন্তু মুখার্জিসাহেবের বৃত্তে সহজেই জায়গা করে নিতে পারে গুরুচরণের মতো সহায়হীন, যে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পায়ের তলার মাটি খোঁজে কলকাতার বুকে। দিদি কিরণবালার হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ভাগনে তরুণের কাজের ব্যবস্থাও করেন তিনি। হেরম্বের ছবি উপন্যাসের যেটুকু পরিসরে এসেছে তাতে বোঝা যায়  তিনি শুধুই একজন কৃতী পুরুষ নন বরং দেশভাগের যন্ত্রণায় তাড়িত হয়ে তাঁর যে আত্মজনেরা চলে এসেছে তাদের পায়েও শক্ত মাটি দেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য।

উপন্যাসের প্রথম অংশে যখন মানুষে মানুষে সম্পর্কের কাঠামোটা তৈরি হচ্ছে তখনও সুজিতকুমার মুখার্জি চরিত্রটি সাবালকত্বের সীমা পেরোয়নি। উপন্যাসে সুজিতের সঙ্গে যখন অনু, গৌরী, টুকি ইত্যাদি চরিত্র একে একে যুক্ত হয় তখন ক্রমশ উপন্যাসের ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হতে থাকে। সুজিতের জীবন হাজারিবাগ, ওয়ালটেয়ার পেরিয়ে পৌঁছে যায় মেরিন ক্লাবে। কখনও সাফল্য, কখনও ব্যর্থতার আস্বাদ পেতে পেতে সে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এর পর দেখা যায় তার জীবনের ভূগোল দেশ ছেড়ে বিদেশের সীমায় পা রাখে। তার মানচিত্রে যুক্ত হয় আমেরিকা, ইজরায়েল বা মিশরের মতো দেশ।

উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বহুস্বরতা বা polyphony। চরিত্রের প্রয়োজনে উঠে আসে আলাদা আলাদা নকশা। প্রত্যেক ব্যক্তির বয়ানে উঠে আসে আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বর। উপন্যাসের একেবারে সূচনাতেই গুরুচরণ হেরম্বের সাহায্যে এবং নিজের পরিশ্রমে পাইস হোটেলটিকে দাঁড় করায়। আবার কিরণবালার স্বামী পূর্ববঙ্গের আভিজাত্যের অচল পতাকাটুকু তুলে ধরে কাটিয়ে দেন বাকি জীবন। তাঁর সারশূন্য বক্তৃতার মধ্য দিয়ে উঠে আসে একটি চরিত্র বা ভাবনার গঠন, এক বিলুপ্ত সময়ের মনন। এই উপন্যাসে অজয়ের স্ত্রী পূজা শান্ত, সুশীলা গৃহবধূর ছবি পাঠকের সামনে তুলে ধরে। অন্যদিকে তার বৈপরীত্যে মালবিকা প্রশ্ন করে সিস্টেমকে, জড়িয়ে যায় রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে। কিন্তু অসহায় নিয়তি দু’জনকেই এক সূত্রে বেঁধে দেয়। পূজার জীবনে নেমে আসে অকালবৈধব্য এবং মালবিকার স্থান হয় রাঁচির মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। উপন্যাস জুড়ে চরিত্রগুলির যখন আসা-যাওয়া চলে তখন সুজিত হয়ে থাকে এই ঘটনাপ্রবাহের মূল আলম্বন। প্রতি অধ্যায়ের সমাপ্তিতে সুজিত জীবনের এক একটি পাঠ গ্রহণ করতে থাকে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘সেই সময়’-এ নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এক বিশেষ সময়কালকে। বহু আগেই কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন কবিতার মর্মে থাকা পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞানের কথা। বস্তুত আধুনিক কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান শর্তই হল সময়বীক্ষা এবং আলোচ্য উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে ধরা পড়েছে সময়ের স্থিরচিত্র। দেশভাগের ঠিক আগে যে উপন্যাসের শুরু হয় তা সমাপ্ত হয় সানফ্রান্সিসকোর বুকে। এই দীর্ঘ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের সময়কালে ফিল্ম স্ট্রিপের মতো ভেসে আসে দেশের স্বাধীনতা, চিন-ভারত যুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, তার উগ্র হিংস্র প্রতিক্রিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি যাবতীয় ছবি। সুজিতের মনে হয়, প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে তার যোগসূত্র রয়েছে। চিন-ভারত যুদ্ধের সময়ে তাকে এক দিনের জন্য হলেও জেলে যেতে হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালীন তার মনে হয়েছিল টুকির সঙ্গে তার জীবনের পথ আলাদা হয়ে গিয়েছে। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মুহূর্তে সে জেনেছিল অজয় হিঙ্গোরানির মৃত্যুসংবাদ। এই মুহূর্তগুলির হাত ধরেই সে কখনও উপলব্ধি করে জীবনের অনিত্যতা, কখনও বা সম্পর্কের সমাপ্তি। আবার সময়ের প্রবাহে, ভারতের মাটি থেকে বহুদূরে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে আলাপ হয় মিরিয়মের। উপন্যাসের দ্বিতীয় স্তরের নির্মাণ গড়ে ওঠে এই পর্বেই।

শিবরত্নমের সুপারিশে ছ’মাসের চুক্তিতে ইজরায়েলে থাকার পর সুজিত চেয়েছিল অন্য কোনও জাহাজের চাকরি। বম্বে মিডল ইস্টার্ন শিপিং কোম্পানিতে নিয়োগ পেয়ে সে যখন তেল আভিভে পৌঁছয় তার পরই তার জীবনে আসে প্রথম বিদেশিনী নারী মিরিয়ম। ইহুদি যুবতী মিরিয়মের সঙ্গে সুজিতের সম্পর্কের প্রথম সূত্র হল ইজরায়েল দেশটি। তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, জেরুজালেম, মৃত সাগর, জর্ডনকে মিরিয়মের চোখ দিয়েই দেখে সুজিত। মিরিয়ম জন্মেছিল কলকাতার বুকেই। তাই আর এক কলকাতাবাসী সুজিতের সঙ্গে তার মানসিক বন্ধন গড়ে উঠতে দেরি হয় না। যেসব স্বপ্নিল পথ ধরে সম্পর্ক আসে তেমনই পথ ছিল প্রাচীন নগরী জেরুজালেম। যার বুকে লেগে আছে যিশুখ্রিষ্টের পায়ের দাগ তার পথ ধরেই প্রথম বার সুজিত মিরিয়মের সহযাত্রী হয়। শুধু তারাই নয়, হয়তো এই সহযাত্রা স্বয়ং লেখকেরও। তাঁর বহু আগের একটি লেখা ‘অতি প্রাচীন এক জনপথ ধরে’ (বিদেশের চিঠি) লেখাটিতে যে ভ্রমণের স্মৃতি ধরা ছিল তা হয়তো বর্তমান উপন্যাসের রূপ নির্মাণ।

ইতিহাসের চক্রচিহ্ন ভরা পথ ধরে সুজিত চলতে চলতে ক্রমশ মিলিয়ে যায় ইজরায়েল থেকে ভারতের বুকে। তার মনে হতে থাকে দুই দেশের ইতিহাসে, উপকথায়, স্বাধীনতা যুদ্ধে কত সাযুজ্য। মিরিয়ম তাকে বোঝায় যুগে যুগে ইহুদিদের দেশছাড়া হওয়ার কাহিনি। বিবাহবিচ্ছিন্না রমণীর সঙ্গে এক অবিবাহিত পুরুষের সম্পর্কের ভিত্তিস্থাপন ঘটে ঐতিহ্যের পথ ধরে। মিরিয়মের সঙ্গে সুজিতের সম্পর্কের শুরুতেই আসে তার পুত্র মোশের কথা, তার স্বামী স্টিভের কথা। সুজিত জানতে পারে, সে দেশে সকলকেই মিলিটারি ট্রেনিং নিতে হয়। পাঠকের মনে হতে পারে, একদিন টুকিকে সুজিত বিপ্লবী ভেবে বিস্মিত হয়েছিল, সেখানে প্রেম ও যুদ্ধের সংযোগ ঘটাতে চেয়েছে মিরিয়ম। সে এও ভাবে,  চলমান জীবনের পথে সংস্কারগুলো কত সহজেই না মুছে ফেলা যায়। একদিন সে নিজেকে ভাল ছেলে বা সৎ, চরিত্রবান ভেবেছিল, পরে কত দ্রুত সে-ই মিরিয়মের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে ধরা দেয়।

যদিও গোটা উপন্যাসে মিরিয়ম ও সুজিতের সম্পর্ক বহুবার, বহুক্ষেত্রে ঘটেছে কিন্তু কখনওই তা উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেনি। বরং সে পাশে চেয়েছে মিরিয়মকে সমুদ্রের পথে। আমাদের মনে পড়ে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের শেষ লাইন— “কপিলা চলুক। একা এতদূর কুবের পাড়ি দিতে পারিবে না”। প্রেম কি পদমর্যাদা, শিক্ষার বাধায় থেমে থাকে? জলরাশি কি স্থির হয়?

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে রচিত হয় উপন্যাসের শেষাংশ অথবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইজরায়েলের পবিত্র উৎসব ইয়মকিপুরের দিন গোটা দেশ ছিল আনন্দোচ্ছল। এমনই এক অক্টোবরের রাতে গাল্‌ফ অব আকারা হয়ে লোহিত সাগরে পৌঁছনোর পরে সুজিত দেখতে পায় আশঙ্কার ভ্রুকুটি। ধীর গতিতে তখন চলছিল প্যাট্রিসিয়া জাহাজ।। জাহাজে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরেও সে অনুভব করে তার একটি সিদ্ধান্তের ওপরেই এতগুলি মানুষের প্রাণ নির্ভর করছে। পরের দৃশ্যে সে দেখে— “মরুভূমির ওপর অনন্ত নীলাকাশ অপরাহ্নের সূর্যালোকে ঝলমল করছে। আর সেই আকাশেই দেখা যাচ্ছে এক একটা যুদ্ধবিমান সগর্জনে সোজা উঠে যাচ্ছে… এ বাস্তব মৃত্যুর প্রত্যক্ষ ধ্বংসলীলা।” জাহাজে সুজিত অনুভব করে সে প্রায় একা এবং তার মুখ চেয়ে এতগুলি প্রাণী। তবুও সে মাথা ঠান্ডা রেখে নির্দেশ দেয় ইজরায়েলি তথ্য লুকিয়ে ফেলার এবং ট্যাঙ্কে জল ভরার। এমনকি ইজিপশিয়ান অফিসারদের দেখার পরেও সে স্নায়ু হারায় না বরং সামান্যতম সুযোগেই প্রতিআক্রমণের নির্দেশ দেয়। চার রক্ষীকে হত্যার পরেও দু’জন অফিসারের জিজ্ঞাসাবাদের সামনেও সে কৌশলে স্বার্থসিদ্ধি করে। যদিও তখনও সুজিত, মিরিয়ম বা তার সহযোগীরা জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত নয় কারণ ইজিপশিয়ানদের হাতে ইজরায়েলের সমস্ত পথই ছিল বন্ধ। সে পথে খুলে দেয় মিরিয়মের বিবাহবিচ্ছিন্ন স্বামী স্টিভ, ইজিপ্টের কোড ব্রেক করে। যুদ্ধচালনা ও জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্ত পথেই মিরিয়ম প্রকৃত কর্মসহচরীর ভূমিকা নেয়। এলাত বন্দরে পৌঁছনো আর পুনর্জন্মের কোনও পার্থক্য ছিল না তাদের কাছে। উপন্যাসের এই পর্বটি নিঃসন্দেহে কোনও রোমহর্ষক ওয়েব সিরিজের উপাদান হতে পারে।

উপন্যাসের এই অংশে আন্তর্জাতিক রাজনীতি যুক্ত হয়ে যায়। ১৯৭৩ আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ যাঁদের স্মৃতিতে আছে তাঁরা সহজেই মনে করতে পারেন সেই কুড়ি দিনের ঘটনাবলী। কিন্তু এর মূল প্রতিপাদ্যটি লুকিয়ে আছে উপন্যাসের একটি লাইনে আর মানবজাতির হৃদয়ে। তা হল— “এক দেশের জমি অন্য দেশের হাতে যায়, এক দেশের ধন অন্য দেশের ব্যাঙ্কে জমা হয়। আর দু’দেশেরই মানুষ মারা যায়। নষ্ট হয়ে যায় কত সাজানো সংসার।” গুগুল ঘাঁটলে এখনও দেখা যাবে সেই যুদ্ধের ফলাফল— “political gain for egypt and israel”। কিন্তু এই যুদ্ধের খেসারত দিতে হয় রোনাল্ডোকে, সেই দুই ইজিপশিয়ান অফিসারকে। অনাথ হয় তাদের সন্তানরা। উপন্যাসের অন্যতম বঞ্চিত ও হতভাগ্য চরিত্র হয়ে থেকে যায় তারা।

এই উপন্যাসের অন্যতম বিশেষত্ব হল তা বাস্তবের ভূমি থেকে উদ্ভূত। সুজিত মুখোপাধ্যায় অবশ্যই কোনও কল্পিত চরিত্র নন, বরং লেখকের পরম সুহৃদ। ইজরায়েলের ইতিহাস, যুদ্ধের খুঁটিনাটি উপন্যাসে বহুবর্ণ রঙে ধরা পড়েছে। সুজিত চরিত্রটির জীবনের একটি রং যদি হয় সাফল্যের শীর্ষে উত্থান, অন্য একটি রং হল সম্পর্কের সূত্র খুঁজে না পাওয়া। যদিও তার অন্যতম গুণ হল জীবনের প্রতি নির্লিপ্ততা। মিরিয়মকে নতুন জীবনের পথে যেমন সে হাসিমুখে বিদায় জানায়, তেমনই সানফ্রান্সিসকো অফিসে পদত্যাগ করতেও সে মূহ্যমান হয় না। সে কারণেই তার উচ্চপদস্থ কর্তাদের কাছেও সে বরাবর প্রশংসিত হয়েছে, তাকে অভিনন্দিত করেছেন শিবরত্নম, টেননেবম সকলেই।

এর আগে আমরা উপন্যাসের সময়বীক্ষার কথা বলেছিলাম। কিন্তু উপন্যাসের প্রতি অংশেই এমন কয়েকটি চরিত্র থাকে যারা বারবার সুজিতকে দেখা দেয় জাগ্রত তন্দ্রার মতো। একদিন তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন সুধীরদা ও খুকু, তাদের ভুলতে পারে না সে। অজয় শুধুই তার বন্ধু ছিল না, তারা একসময় ছিল হরিহর আত্মা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাতে যখন সুজিত জানতে পারে যে শিবলাল-সুজাতার সন্তান আর কখনও আর ফিরবে না তখন সে উপলব্ধি করে নিয়তির পরিহাস।

সময়ের পাশাপাশি স্থান ও পটভূমিও গুরুত্ব পেয়েছে এই উপন্যাসে। একদিন সমুদ্রশহর ওয়ালটেয়ারে বদলি হওয়া হেরম্ব কি কখনও ভেবেছিলেন তার কনিষ্ঠ পুত্রটি জীবনের পথ খুঁজবে সমুদ্রে? নীল সাগরের বুকে সুজিতকে যে পাঠক খুঁজে পান তিনি স্বচ্ছন্দে মিলিয়ে নিতে পারেন বালক অপুকে, পথের পাঁচালির শেষতম পরিচ্ছেদে। “নীলকুন্তলা সাগরমেখলা ধরণীর” ছবি সুজিতের জীবনে বারবার রং-তুলি হয়ে ওঠে। আবার যুদ্ধক্ষেত্রের কুশলতা, সমরাঙ্গণে লড়ার দক্ষতা এবং ক্ষুরধার বুদ্ধি বুঝিয়ে দেয় সে কাব্যিক নয়, বাস্তববাদী। সেজন্যই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত হিসেবেই দেখতে চেয়েছে বরাবর। যখন সে দেশকে বিপন্মুক্ত করে, তখন সে দেখে এক জনস্রোত তাকে রেড কার্পেটের অভিনন্দন জানাচ্ছে। কোথাও যেন তার মনে হয় fortune favours the brave।

হয়তো সেজন্যই এই উপন্যাসে প্রশ্ন জাগে সুজিতের সাফল্যের মাত্রা নিয়ে। সুজিত মেরিন পড়তে গিয়েছিল রকির পরামর্শে, যে রকি তাকে পানশালায় দু’বার অপদস্থ করলেও তার জীবনের পথ গড়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিক্ষেত্রেই তার অমিত সাফল্যের পাশাপাশি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে সমকালীন বাংলা তথা ভারতের দারিদ্র ও বেকারত্বের সংকট নিয়ে। সেই বিপন্ন সময়ের যুবসমাজকে উপন্যাসে কিঞ্চিৎ পেলে ভাল লাগত।  রঞ্জিত, দেবাংশু, সন্দীপ সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই মনে হয় জীবনে পথ হারিয়ে ফেলা একটি ব্যর্থ চরিত্রের প্রয়োজন ছিল। মালবিকা ছাড়া আর এ ধরনের চরিত্র উপন্যাসে নেই।

এই উপন্যাসের বেশ কিছু অংশের ভাষা সর্বাংশে আকর্ষণীয় হয়নি। প্রসঙ্গত বলা যায় সংলাপের কথা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা আড়ষ্ট মনে হয়েছে। যুদ্ধের পটভূমির আগের কিছু অংশ কিছুটা হলেও অনাবশ্যক দীর্ঘায়ত মনে হয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির বর্ণনা এবং মিরিয়মের চোখে জেরুজালেমের বর্ণনা বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে।

তিনশো পৃষ্ঠার বেশি দৈর্ঘ্যের উপন্যাসের শেষে মনে হয়, সুজিত দেশের নীরব সৈনিক হয়ে হয়তো বিশ্বে পরিচিতি পেল না। নিজের সমাজে সে সম্মান পেল কিন্তু মালবিকা, অজয়, রোনাল্ডোদের জীবন তো শূন্যতায় পর্যবসিত হল। রাঁচিতে রেখে আসা তার বোন অমিতার জীবনকে বলা যায় অবদমিত অভিমানের বিস্ফোরণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার আগে সুজিত হয়তো ভাবে তার প্রতি অন্যায় হল।

কিন্তু তবুও কি সুজিতদের চলা শেষ হয়?

উপন্যাসের শেষের কয়েকটি পর্বের ঘটনা অভাবনীয়। পাঠককে আবেগবিহ্বল করে দেওয়ার পক্ষে তা যথেষ্ট মানবিক। মনে হয় যেন অনেক আবর্ত পেরিয়ে জীবনতরী কোনও পাড়ে ভিড়ল। তবে দ্বিতীয় খণ্ড লেখক যদি লেখেন তখন হয়তো দেখা যাবে নতুন জীবনসঙ্গিনী অনুকে নিয়ে আবার পাড়ি দেবে সুজিত। সমুদ্রের বুকে কখনও কখনও আবর্ত রচিত হয় কিন্তু নদী থেকে সাগর হয়ে মহাসাগরের পথটাই তো লক্ষ্য। পঞ্চাশ বছরের জীবন পেরিয়ে আবর্তদর্শন করে সুজিত হয়তো আবার এগিয়ে যাবে অন্য কোনও অভিযানের পথে।

 

 

আবর্ত

মদনগোপাল মুখোপাধ্যায়

দেজ পাবলিশিং

৪৯৯ টাকা

Comments are closed.