বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

বিপন্ন ম্যানগ্রোভ, বিপন্ন সুন্দরবন

রাজনৈতিক লোকজনও জঙ্গল কাটা তাদের অধিকারের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে। আসলে যারা এইসব কাজ করে তারা কেউই জঙ্গলের পাশে বা নদীর ধারে থাকে না। তারা জঙ্গলের পাশের লোকজনদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে ফেলে। এবার ভোটে গাছ কাটলাম, পরের ভোটে জায়গা দিলাম, কলোনি বানালাম, আরও কত কিছু করলাম।

উমাশঙ্কর মণ্ডল

 

সমুদ্রের জলস্তর যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে এই শতাব্দীর মাঝামাঝিই তলিয়ে যেতে পারে গোটা বিশ্বের উপকূলবর্তী অনেক শহর, যার মধ্যে রয়েছে কলকাতা, মুম্বই এবং নবি মুম্বইয়ের মতো একাধিক শহর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিজ্ঞান সংস্থা ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর একটি গবেষণায় এবার এমনই তথ্য উঠে এল। তাতে বলা হয়েছে, জলস্তর বৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ৩০ কোটি মানুষ। বাসভূমি হারাতে পারেন ১৫ কোটি মানুষ। এশিয়াতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।

‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর গবেষণাপত্র ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ বলা হয়েছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমুদ্রে জলস্তরের ওঠানামা এবং স্থলভূমির ওপর তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে ওই সংস্থা। তাতেই এমন বিপদ সংকেত মিলেছে। দেখা গিয়েছে, ২০৫০-এর মধ্যেই সমুদ্রের জলস্তর উপকূল ছাপিয়ে পাকাপাকিভাবে ওপরে উঠে আসতে পারে।

বিশ শতকে গোটা বিশ্বে সমুদ্রের জলস্তর ১১-১৬ সেন্টিমিটার বেড়েছিল। বর্তমান শতাব্দীতে তা ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর বিজ্ঞানীদের দাবি, গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে যে হারে বিশ্ব উষ্ণায়ন বেড়ে চলেছে তাতে আন্টার্কটিকার বরফের চাদর নির্ধারিত সময়ের আগেই গলতে শুরু করলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সমুদ্রের জলস্তর ২ মিটারেরও বেশি বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এবং চিনই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ সমুদ্র উপকূল অঞ্চলে বাস করেন। চিনে এই সংখ্যাটা ৪ কোটি ২০ লক্ষ। অবিলম্বে তাঁদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত বলে মত ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের আধিকারিক ডিনা লোনেস্কোর। তাঁর কথায়, ‘‘বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছি আমরা। আমরা জানি কী হতে চলেছে। নাগরিকদের স্থানান্তরিত করতে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সব দেশের সরকারের।’’

মেরু বলয়ের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখা দিয়েছে আগেই। তার মধ্যে গ্রিনল্যান্ডে ২২ গিগাটন (১০০ কোটি মেট্রিক টন) বরফের চাদর গলে জল হয়ে গেল। তাপমাত্রা অনেকটা ওপরে চলে যাওয়াতেই এই বিপত্তি বলে জানিয়েছেন ডেনমার্কের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে ১৯৫০ সালের পর এটাই তৃতীয় সর্বোচ্চ বরফের ক্ষয় বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাপমাত্রা না কমলে আগামী দিনে এর চেয়েও বড় ক্ষতি হতে পারে।

ডেনমার্কের মেরুবলয় নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা বরফের চাদর গলে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আনে। তারা জানায়, পরিমাণের দিক থেকে ২০১৯-এর মতো না হলেও গ্রিনল্যান্ডে এত ভয়ংকরভাবে বরফ গলেছে যাতে আমেরিকার ফ্লোরিডা জুড়ে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত জল জমে যেতে পারে।

বরফ গলে যাওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস সেন্টিনেল-২ উপগ্রহের তোলা যে ছবি সামনে এসেছে তাতে দেখা গিয়েছে, মেরুসাগরের তীরের বিস্তৃত এলাকার মাটি বরফের চাদরের নীচে থেকে উন্মুক্ত হয়ে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যে ২২ গিগাটন বরফের চাদর গলেছে তার মধ্যে ১২ গিগাটন বরফ গলে সাগরের জলে মিশে গিয়েছে। তুষারপাতের ফলে বাকি ১০ গিগাটন শুষে নিয়েছে মাটির ওপরের বরফের পুরু স্তর। ধীরে ধীরে ফের জল জমে বরফ হয়ে যাবে।

 

 

অশনি সংকেতঃ গলছে মেরুপ্রদেশের বরফ

১৯৯০ থেকেই মেরুবলয়ে বরফ গলতে শুরু করে। শুরুতে তা চোখে পড়ার মতো না হলেও যত সময় এগিয়েছে ততই দ্রুতগতিতে বরফ গলতে শুরু করেছে। ২০০০ সালে যে গতিতে বরফ গলছিল বর্তমানে তার চেয়ে চার গুণ বেশি দ্রুতগতিতে বরফ গলছে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। অ্যান্টার্কটিকাকে বাদ দিলে গ্রিনল্যান্ডেই স্থায়ী বরফের চাদর রয়েছে। যে কারণে গ্রিনল্যান্ডই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিষ্টি জলের আধার। আন্টার্কটিকা এবং গ্রিনল্যান্ডেই বিশ্বের ৭০ শতাংশ মিষ্টি জল সঞ্চিত রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফের চাদর গলে গেলে গোটা বিশ্বে সমুদ্রের জলস্তর ২০ থেকে ২৩ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই পরিবর্তন চোখে পড়ছিল। তবে আগে যা ছিল স্তিমিত, ধীর গতি, এখন সেই পরিবর্তন ঘটছে দ্রুতগতিতে। এখনই সংযত না হলে ধ্বংসের আর বেশি বাকি নেই। বেশ কয়েক বছর ধরে সতর্ক করার পর এবার জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এমনই লাল সংকেত দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। ১৯৫টি সদস্য দেশকে নিয়ে বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের ষষ্ঠ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তঃরাষ্ট্র প্যানেল (আইপিসিসি)। তাতে বলা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে কোনও দেশই রক্ষা পাবে না।

ভারত-সহ সদস্য দেশগুলির সঙ্গে বৈঠকে  আইপিসিসি-র রিপোর্টটি পেশ করেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব অ্যান্টোনিয়ো গুতালেস। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে বিজ্ঞানীরা যা আঁচ করেছিলেন তার চেয়ে এক দশক আগেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্বের উষ্ণায়ন সার্বিক ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে ১৯০১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সমুদ্রের জলস্তর যেখানে প্রতি বছর ১.৩ মিলিমিটার করে বাড়ছিল, ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালে তা বছরে ৩.৭ মিলিমিটারে গিয়ে ঠেকেছে। সামগ্রিকভাবে ১৯০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গোটা বিশ্বে জলস্তরের গড় বৃদ্ধি ছিল ০.২০ মিটার।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণেই জলবায়ু সহনশীলতার মাত্রা পেরিয়ে যাচ্ছে। তাই ১৯৫০ সালের পর থেকে তাপপ্রবাহের তীব্রতা লাগাতার বেড়ে চলেছে এবং আগের থেকে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ বইছে। সেই তুলনায় শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা অনেক কম এবং ঘন ঘন তার প্রকোপে পড়তে হয় না বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রতি ১০ বছরে একবার বা প্রতি ৫০ বছরে একবার যে তীব্র বন্যা, খরা হয়, আগামী দিনে তা আরও ঘন ঘন দেখা দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। যেসব জায়গায় এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সচরাচর চোখে পড়ে না সেগুলিও বাদ যাবে না বলে জানিয়েছেন তাঁরা। এমনকি একই জায়গায়, একই সময়ে তাপপ্রবাহ এবং খরা একইসঙ্গে দেখা দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে মত তাঁদের।

বিজ্ঞানীদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাতাসের গুণমান একই মুদ্রার দুই পিঠ, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে একসঙ্গে দুটো দিকেই নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ঘনবসতি, যত্রতত্র গগনচুম্বী নির্মাণে রাশ টানতে হবে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নির্মাণের সরঞ্জামের দিকে নজর দিতে হবে। আরও বেশি করে সবুজ জঙ্গল, উদ্যান তৈরি করতে হবে। গার্হস্থ্য এবং শিল্পজনিত উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণগুলিও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে সব দেশের সরকারকে। জীবাশ্ম জ্বালানি, গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন কমিয়ে আনতে হবে। তাতে চলতি শতকে কিছুটা হলেও বিশ্ব উষ্ণায়নে রাশ টানা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

বড়সড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা ঘনাচ্ছে ভারতে। সতর্কবার্তা দিয়েছে নাসা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে যে, এই শতকের শেষে দেশের মুম্বই, চেন্নাই, কোচি এবং বিশাখাপতনম-সহ ১২টি উপকূলীয় শহর ৩ ফুট জলের তলায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সারা বিশ্বের জলবায়ু নিয়ে ভাবনার জন্য তাবড় তাবড় নেতা আছেন। বাড়ির পাশে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ওপর সাধারণ মানুষের প্রভাবও যথেষ্ট আলোচনার ব্যাপার।

ম্যানগ্রোভ কেটে বিঘের পর বিঘে জমিতে গড়ে উঠছে বসতি। কিছু রাজনৈতিক নেতার মদতেই সবুজ ধ্বংস করে এভাবে বেআইনি দখলদারি চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। একসময় ঝড়খালিতে বনমহোৎসবে এসে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বন দফতরের মন্ত্রী। সবুজ ধ্বংসের পিছনে যাদের হাত রয়েছে তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘটনার পরে এক মাস কাটতে না কাটতেই ক্যানিংয়ের মাতলা নদীর চরে ম্যানগ্রোভ কাটার ঘটনা সামনে এল। দিঘির পাড়, মাতলা ও মাতলা চর মৌজায় দিনের পর দিন প্রকৃতি ধ্বংস করে গড়ে উঠছে জনবসতি। মাতলা নদীর চর ক্যানিং মহকুমার উন্নয়নস্থল। চর এলাকার একদিকে স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে মহকুমা শাসকের দফতর। বাস টার্মিনাসও তৈরি হয়েছে এখানে। আগামী দিনে আদালত-সহ আরও বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প নদীর চরে গড়ে ওঠার কথা।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংসের প্রতিযোগিতা চলছে স্হানীয় প্রশাসনিক সহযোগিতায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও সতেজ আয়লার স্মৃতি, ফণীর আতঙ্কে ভুগেছেন তাঁরা।

আয়লার তাণ্ডবে বিধ্বস্ত সুন্দরবন

২০০৯-এর ২৫ মে। বিধ্বংসী আয়লার তাণ্ডবে তছনছ হয়েছিল সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ অরণ্য লন্ডভন্ড হয়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ। গৃহহীন হয়েছিলেন অগণিত। সমুদ্রের নোনা জল পুকুর, খেতে ঢুকে পড়ায় সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। ১০ বছর আগের সেই স্মৃতি উসকে দিয়ে ধেয়ে এসেছিল ফণী।

আয়লার তাণ্ডবে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নদীবাঁধ ভেঙে জলের তলায় চলে গিয়েছিল শতাধিক গ্রাম। ক্যানিং মহকুমার গোসাবা ব্লকের সাতজেলিয়া, সোনাগাঁ, লাহিড়িপুর, মোল্লাখালি, কুমিরমারি, আমলামেথি, রাঙাবেলিয়া, বাসন্তী ব্লকের ঝড়খালি, নফরগঞ্জ, জ্যোতিষপুর, ভরতগড়-সহ সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিশ্চিহ্ন হয়েছিল বহু কাঁচা ও পাকা বাড়ি। জয়নগরের একাধিক ব্লকও আয়লার হাত থেকে রেহাই পায়নি।

ফণীর প্রভাবেও বয়েছিল ঝোড়ো হাওয়া। যদিও ফণীর সঙ্গে মোকাবিলায় আগে থেকেই আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছিল প্রশাসন। উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ সন্দেশখালি, হাসনাবাদ-সহ সুন্দরবন লাগোয়া বিভিন্ন এলাকায় ফণীর মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল প্রশাসন। আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিল বিপর্যয় মোকাবিলা দল।

আমরা সকলেই জানি, ম্যানগ্রোভ নদীর বাঁধকে প্রবল ঢেউয়ের হাত থেকে বাঁচায়। তাহলে কেন এই নিধনযজ্ঞ চলছে? এই সত্য বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই জানে। জানে না শুধু  গতানুগতিক রাজনীতি যারা করে থাকে। আর্থিক সচ্ছলতা সবাই চায় কিন্তু তাই বলে ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বৃহত্তর ক্ষতিসাধন মোটেই কাম্য নয়। সারা পৃথিবী যেখানে গাছ লাগাও প্রাণ বাঁচাও পরিবেশ বাঁচাও স্লোগান নিয়ে এগিয়ে চলেছে সেখানে এই ধরনের জঙ্গল কাটা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

২০০৯ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে মানুষ ভুলে গেল সেই ঝড়ের বিভীষিকার কথা। রাজনৈতিক লোকজনও জঙ্গল কাটা তাদের অধিকারের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে। আসলে যারা এইসব কাজ করে তারা কেউই জঙ্গলের পাশে বা নদীর ধারে থাকে না। তারা জঙ্গলের পাশের লোকজনদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে ফেলে। এবার ভোটে গাছ কাটলাম, পরের ভোটে জায়গা দিলাম, কলোনি বানালাম, আরও কত কিছু করলাম।

সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি বিশ্ব উষ্ণায়নকে সামনে রেখে সারাবছরই প্রশাসন থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। কিন্তু তার পরেও একশ্রেণির মানুষের যে কোনও হুঁশ ফেরেনি তার প্রমাণ রয়েছে। পাথরপ্রতিমার জি-প্লট দ্বীপের চাঁদমারি ফেরিঘাটের কাছে বড় অংশের জায়গা জুড়ে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে মাছের ভেড়ি গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।

নির্বিচারে গাছ কাটার পর মাটি ফেলে ভেড়ি বাঁধার কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে নোনা জলে মাছ চাষের ভেড়ি। বিষয়টি নজরে আসার পর বনদপ্তর ও প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রেঞ্জার অফিসের আধিকারিক ও কর্মীদের বারবার জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ জানানোর পরও ম্যানগ্রোভ কাটা বন্ধ করা যায়নি। পরিবেশপ্রেমী সুভাষ দত্ত বলেন, ‘কলকাতার ছাতা’ সুন্দরবন। সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে শহর কলকাতাকে রক্ষা করে সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভ। মাছের ভেড়ি তৈরির নামে যেভাবে একশ্রেণির অসাধু মানুষ অবলীলায় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করছে তাতে আমরা বিপন্ন বোধ করছি।

অব্যাহত ধবংসলীলা

সুন্দরবনের অন্যান্য দ্বীপাঞ্চলের মধ্যে অন্যতম পাথরপ্রতিমার জি-প্লট। এই দ্বীপের কৃষ্ণদাসপুর ও সত্যদাসপুর গ্রামের সংযোগস্থলে চাঁদমারি ফেরিঘাটের কাছে চালতা বুনিয়া নদীর চরে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল ছিল। ২০০৯ সালে সেচ দপ্তরের আওতাধীন ওই জায়গায় সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের পক্ষ থেকে নদীর চর লাগোয়া জায়গাতে বনসৃজন করা হয়েছিল৷ অভিযোগ, ওই জায়গার বড় অংশ জুড়ে অবাধে বাদাবন কেটে মাছের ভেড়ি তৈরির কাজ শুরু করে কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী৷ কাটা হয়েছে বাইন, তরা, গরান, গর্জন, কেওড়া ও গেঁয়ো প্রজাতির ম্যানগ্রোভ৷ কয়েকশো কাটা গাছের মূল্য প্রায় লক্ষাধিক টাকা ছাড়াবে বলে স্থানীয়দের অনুমান।

ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের পাশাপাশি মাছের ভেড়ি তৈরির বিরোধিতায় সরব হয়েছিলেন এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ। ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে একের পর এক মাছের ভেড়ি গড়ে উঠলে আগামী দিনে এই দ্বীপ এলাকা ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকার বাসিন্দারা। যেভাবে নির্বিচারে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংস চলছে তাতে আগামী দিনে এই দীপাঞ্চল ভয়ংকরভাবে নদী ভাঙনের মুখে পড়বে৷ বনদপ্তর ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানালেও এই গাছ কাটা আটকাতে কারও কোনও হেলদোল নেই।

জঙ্গল সাফ করে তৈরি হচ্ছে ভেড়ি। কাঠ চুরি হচ্ছে। নদী চরের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল কেটে তৈরি হচ্ছে বেআইনি মেছোভেড়ি। চোরাগোপ্তা ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলায় প্রতিমুহূর্তে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন। একদিকে যেমন নদীবাঁধের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনই বিপন্ন হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। সম্প্রতি বাসন্তী ব্লকের ভরতগড় পঞ্চায়েতের আনন্দবাদ মৌজার মাতলা নদীর চরের কয়েকশো বিঘা ম্যানগ্রোভ জঙ্গল কেটে বেআইনি মেছোভেড়ি তৈরি হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, স্থানীয় অনেক লোকজন জ্বালানি কাঠের জন্য ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করছেন। অনেকে আবার ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে কাঠ চুরি করে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এসব বিষয়ে প্রশাসনের নজর নেই বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের।

বনসৃজন প্রকল্পে বিভিন্ন পঞ্চায়েত বছরের নানা সময়ে নদীর চরে গাছ লাগায়। সুন্দরবনের মাতলা, বিদ্যা, গোমর, হোগল নদীর চরে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগিয়েছিল সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ। আয়লার পরে সুন্দরবনে বিভিন্ন সময়ে সরকার থেকে গাছ লাগানোর প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জঙ্গল থেকে জ্বালানি সংগ্রহের জন্যও নষ্ট হচ্ছে ম্যানগ্রোভ।

পরিবেশবিদেরা মনে করেন, এভাবে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করা হলে সুন্দরবনের নদীবাঁধ দুর্বল হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে আয়লার মতো জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় তলিয়ে যাবে।

‘একটি গাছ একটি প্রাণ’। এই উক্তিটি ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় স্কুলপড়ুয়াদের। বিভিন্ন জায়গায় চলে গাছ লাগানো অভিযান। কিন্তু সে বার্তা যে মানুষের কাছে পৌঁছয় না তা বোঝা যায় তখন, যখন জঙ্গল সাফ করে বেআইনি নির্মাণ হয়। প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবার সুন্দরবনে চলছে গাছ কেটে গৃহনির্মাণ। কেটে ফেলা হচ্ছে বহু জঙ্গলের মূল্যবান গাছ। এমনটাই অভিযোগ সুন্দরবনের অন্তর্গত ঝড়খালির বাসিন্দাদের। নদীর চরের জঙ্গলের গাছ কেটে অবৈধ নির্মাণ শুরু করেছে বেশ কিছু অসাধু ব্যবসাদাররা। বলছেন স্থানীয় মানুষজন। সাফ করা হচ্ছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য। হারাচ্ছে সুন্দর পরিবেশ, হারাচ্ছে বন্যপ্রাণীর বাসস্থান। পরিবেশে আসছে দূষণ। তবুও হুঁশ নেই মানুষের।

Comments are closed.