বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

নামকেত্তন

যতই শেক্সপিয়ার সাহেব বলুন, নামে কী এসে যায়, আমি কিন্তু সহমত নই। আলবাত যায়, আলবাত আসে। নামে অনেক কিছু যায়-আসে। খামোখা কিছু বদনাম, লাঞ্ছনা, অবহেলা জীবনভর অনাবশ্যক বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এরকম নামধারী বহু মানুষ আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

স্বপন নাগ

 

নাম। নাম দিয়ে যেমন চিনে নিতে পারি নির্দিষ্ট কাউকে, সেই নামেরও আবার ওঠানামা আছে। কোনও নাম শুনলেই মন উতলা হয়, আবার কোনও নাম কেউ কেউ মুখে নিতে চায় না। এমনকি কানে শোনাও পাপ কারও কারও কাছে। রামনামে ভূত পালায়। অন্যদিকে, নামকীর্তনে পুণ্যার্জনও কম লোভনীয় নয়। দামে নয়, নামে কাটে এমন কত কিছু আমাদের নিত্য ঠকিয়ে যাচ্ছে, সে হিসেব আর ক’জন রাখে! একবার নাম হয়ে গেলে কারও পোয়াবারো। পায়ের ওপর পা তুলে দিন কাটাও। কারও আবার বিড়ম্বনা। নাম ধরে রাখতে আমৃত্যু লড়াই চালাও। নামকরা পিতার নাম ডোবানো ছেলেদের গল্পও অনেকের জানা। কেউ নামী তো কেউ বদনামী।

আগের দিনে বাঙালির নাম নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। ফেলা, বেচা, বটু, ছোটে, লালু যাহোক কিছু একটা রাখলেই হল। সোমবারে জন্মেছে— নাম সোমনাথ, মঙ্গলবার হলে মঙ্গলা, বুধে বুধোয়া, আর যদি হয় বিষ্যুদবার, নাম রেখে দাও বেস্পতি। বেশ লক্ষ্মীমন্ত নাম। দিন পাল্টেছে। দীর্ঘ এই অবহেলা চলতে পারে না। অথচ, নাম নিয়ে চিরকাল যত গোলমাল।

‘কী নামে ডেকে বলব তোমাকে…’ শোনার পর থেকেই কিনা জানি না, নাম নিয়ে বাঙালি এর পর ছোটখাটো বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কল্পনা আর উদ্ভাবনী শক্তির সমন্বয়ে দুরূহ সব নাম তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে জুড়ে দিতে শুরু করল। ভাবখানা এরকম, এমন নামটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।

যতই শেক্সপিয়ার সাহেব বলুন, নামে কী এসে যায়, আমি কিন্তু সহমত নই। আলবাত যায়, আলবাত আসে। নামে অনেক কিছু যায়-আসে। খামোখা কিছু বদনাম, লাঞ্ছনা, অবহেলা জীবনভর অনাবশ্যক বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এরকম নামধারী বহু মানুষ আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। নামের সঙ্গে উড়ে এসে জুড়ে বসা লেজুড়গুলোর উৎস সন্ধানে ভাষাবিদরা হদিশ দিতে পারেন হয়তো বা। তবে সেইসব নামধারী ব্যক্তিদের বিড়ম্বনা একটুও কমে না তাতে।

এই যেমন আমার বন্ধু, পোশাকি নাম মানিক ভটচার্য। বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল চেহারা ছিল ছেলেবেলায়। গাত্রবর্ণটি ছিল অধিক মাত্রায় কালো। ওর দাদু আদর করে ওকে কেলো মানিক বলে ডাকতেন। সেই থেকে ওর নাম কেলো। শুরু শুরুতে কেউ গা করেনি। করার কথাও নয়। দিনেকালে মানিক বড় হল। স্কুলে ভর্তিও হল। পাড়ায়, বন্ধুমহলে কেলো নামই কিন্তু পরিচিতি দিল। আর এই নাম ঘিরেই মানিকের বিস্তর দুঃখ। জিজ্ঞাসাও। কে কোথায় বাজে কাজ করছে, সেইসব অপকর্মের দায়ভাগ ‘কেলোর কীর্তি’ শিরোপায় ভূষিত হচ্ছে। ছোট-বড় যেকোনও হুজ্জতকেই যখন লোকে কেলো বলে চালাচ্ছে তখন মানিকের রাগ সেই লোকগুলোর ওপর যত না হয়, তার চেয়ে বেশি রাগ হয়  দাদুর ওপর।

কিছুতেই ভুলতে পারি না আমাদের স্কুলের ক্লাসের মধ্যে সেই মারপিটের কথা। আমরা বোধহয় তখন ক্লাস এইটে। সমাস-কারক এইসব শিখছি-টিখছি। পড়াশুনায় ভাল ছিল কিন্তু খুব ফাজিল ছিল তন্ময়। আলটপকা জিজ্ঞেস করে বসল, বল তো, কেলেঙ্কারির ব্যাসবাক্যসহ সমাস কী হবে? কেউই উত্তর দিতে পারছি না দেখে তন্ময়ই জবাব দেয়— কেলোর মায়ের এনকোয়ারি। শুধু ব্যাসবাক্যটিই বলতে পেরেছিল, সমাসের নাম বলার আগেই তন্ময়ের পিঠে, মুখে, মাথায় এলোপাথাড়ি কিল বসাতে থাকে মানিক। অনেক কষ্টে সবাই মিলে ওদের নিরস্ত করি।

ফোন এলে ‘বলো’ বলেই রিসিভ করার অভ্যেস আমার। যেমন বলো অসীম, বলো শ্যামল, বলুন হারুদা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বন্ধু হরির ফোন রিসিভ করতে গেলেই আমি বিপদে পড়ি। রিসিভ করি ‘হ্যাঁ শুনছি’ জানান দিয়ে। বলা বাহুল্য, এই বিপর্যয় হরি নামধারী বন্ধুটির নয়, একান্তই আমার।

পালপাড়ার নবতিপর হরিদাসবাবু এলাকায় সিনিয়র মোস্ট। লোকে বলে, তিনি সেঞ্চুরি করার পথে। এখনও শরীর স্বাস্থ্য দিব্যি আছে। হরিদাস পালের নাম করলেই যে কেউ এককথায় তাঁর বাড়ি দেখিয়ে দেয়। ইদানীং তাঁর নাম এত বেশি চারপাশের লোকজনের মুখে মুখে ঘোরে যে হরিদাসবাবু বেশ বিরক্তই তাতে। এই আদ্যন্ত নিরীহ নামটি ধরে মানুষকে এলেবেলে নস্যাৎ করার প্রবণতাটি হরিদাসবাবু এই বয়সেও মন থেকে মানতে পারেন না।

তপেন আর মানস দুই বন্ধু। বয়সেও এক। এক স্কুলে পড়ে। এক মাঠে খেলে। টিউশনও পড়ে একই মাস্টারের কাছে। যেখানেই যায়, একসঙ্গে। হরিহরবাবু ওদের দেখলেই বলে ওঠেন, এই যে জগাই-মাধাই, কোথায় চললে? হরিহরজেঠুকে একটুও ভাল লাগে না ওদের। দেখা হলেই সেই একই কথা— জগাই-মাধাই। ওরা ঠিক করে, একদিন শুনিয়ে দেবে, আমরা যে হরিহর আত্মা জেঠু! যদিও বলাটা ঠিক হবে কিনা  ভেবে এখনও বলা হয়ে ওঠেনি।

যাদের নাম গোবিন্দ তাদের কথা ভাবলে আমার খুব কষ্ট হয়। নামের সঙ্গে ঢোল, দুয়ে মিলে ঢোলগোবিন্দ। কেন যে এই ঢোলের সংযুক্তি— গোবিন্দরা যেমন পায় না, আমিও কোনও যুক্তি খুঁজে পাই না। গোবিন্দর মতো আপাদমস্তক শান্ত ছেলেটিকে কে যে গোঁয়ার আখ্যায়িত করল তা ভেবে গোবিন্দ যুগপৎ দুঃখিত ও জিজ্ঞাসু হয়। কেন যে শুধু শুধু গালফোলা গোবিন্দর মায়ের নামে মাসিমাকে ধরে টানাটানি, তাও বুঝি না।

আর খগেন! বাপের নাম খগেন করে দেবার হুমকি যে কেন, তারও কোন কুলকিনারা পাই না। এ নিয়ে খগেনেদেরও দুঃখের অন্ত নেই। তবে সান্ত্বনা এই যে, এখন আর এসব নাম উঠে গেছে বললেই হয়। কাজেই আগের ওইসব নামের লোকেদের ‘স্মৃতি সততই দুঃখের’ ছাড়া আর কী-ই বা ভাবা যেতে পারে।

তখন আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। ছ-সাত জন ছেলেমেয়েদের একটা দল ছিল আমাদের। ক্যান্টিনে, রেস্তোরাঁয়, সিনেমায় দলবেঁধেই যেতাম। সেই দলে বর্ণালী, নীপার সঙ্গে গৌরীও ছিল। সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে পড়তেই সজলের সঙ্গে, মানে সজল সেনের সঙ্গে গৌরীর বিয়ে হয়ে গেল। আর যায় কোথায়! বিয়ের পর গৌরী হয়ে গেল গৌরী সেন। মনে পড়ে,  তার পর থেকে রেস্তোরাঁয় কিংবা অন্য কোথাও টাকা দেওয়ার সময় হলেই আমরা সমস্বরে বলে উঠতাম, টাকা দেবে গৌরী সেন। অবশ্য তা সে দিতও।

একবার ইউনিভার্সিটির দোতলা থেকে সবাই মিলে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ইন্দ্র কীভাবে যেন পড়ে গিয়েছিল। আমরা তো বেশ ঘাবড়েই গেছি। উৎকণ্ঠায় জানতে চাই কোনও বড়সড় চোট পেল কিনা। ইন্দ্র কিন্তু নির্বিকার। চটপট ধুলো-টুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কিসসু হয়নি। এ হল ইন্দ্রপতন, বুঝলি! নন্দ তখনও ওপরের সিঁড়িতে। তেমন বড় কোনও বিপদ হয়নি বুঝে আশ্বস্ত হবার পর আমরা সবাই নন্দর দিকে আঙুল তুলি। ব্যাটা যত দোষ নন্দ ঘোষ। নন্দও সমস্ত দোষের ভাগীদার হবার জন্য নামভাগ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে অনেক দিন আগে থেকেই। ফলে খ্যাঁক খ্যাঁক হাসি ছাড়া ওর মধ্যে বিরূপ কোনও প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ করিনি সেদিন।

কার্তিক আর মদন দুই ভাই। ‘ক্যালানে কার্তিক’ আর ‘কোথাকার মদন রে’ ইত্যকার ছিছিক্কার শুনতে শুনতে দু’জনের জীবন প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। পরে কোর্টে গিয়ে দু’জনেই এফিডেবিট করে নাম বদলে যথাক্রমে কাজল আর মলয় করে নিয়েছে। পিতৃদত্ত নামদুটিরই আদ্যক্ষর অক্ষত রেখে পরলোকগত পিতৃদেবের প্রতি সম্মান জানিয়েছে। কিন্তু কোর্ট মানল, পাড়া-প্রতিবেশী মানল না। এখনও পুরনো নামেই ডাকে সবাই।

চিন্ময়বাবুর ছোট ছেলে তো উঠেপড়ে লেগেছিল। হয় নাম অথবা পদবি, যেকোনও একটা বদলাবেই বদলাবে। সমস্যাসংকুল পদবি-সহ ছোকরার নাম ছিল মৃন্ময় পাত্র।

আরও দু’ভাইয়ের গল্পও এখানে বলা যেতে পারে। কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী আর বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী। কেষ্ট চক্কোত্তি আর বিষ্টু চক্কোত্তি নামেই ডাকে সবাই। তা ডাকুক, আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের যখন ‘ওরাই এ গ্রামের কেষ্টবিষ্টু’ বলে কেউ উপহাস করে তখন ওরা দুঃখ পায়।

ফাটাকেষ্ট নামে ‘ফাটা’ শব্দে যে গ্ল্যামার, যে পরাক্রম, এতদিনে আমরা সবাই তা জেনে গেছি। ‘ফাটাকেষ্ট এম এল এ’ সিনেমায় মিঠুন চক্রবর্তী কেষ্ট নামকেই মহীয়ান করে তুলেছেন। ফাটাকেষ্ট, হাতকাটা দিলীপ, কানা ভোলা, হুব্বা শ্যামল— নামের আগে ব্যবহৃত এইসব বিশেষণগুলো সমাজে, নিদেনপক্ষে মহল্লায় বেশ সমীহ আদায় করে নিতে পারে। আমাদের জগন্নাথদার আফশোস, তার নামের আগে ‘ঠুঁটো’ বিশেষণটি আজও গ্ল্যামারের সেই ডিগ্রিতে পৌঁছতে পারল না।

পাঁচ ভাইয়ের এক ভাই নীলমণি যেমন ‘সবেধন’ বিশেষণের কারণ খুঁজে পায় না। একইরকম হয়রান গণেশ, ভাবে গোবরগণেশ কী হেতু? গদাই লস্করের দুঃখটাই বা কম কীসে?

কত আর দুঃখী মানুষের কথা বলব! আমাদের হরি ঘোষও কি কম দুঃখী! ব্যারাকপুর লোকালে আমার সহযাত্রী। আটটা চল্লিশের লোকালে উনিও রোজ একসঙ্গে অফিসে যেতেন। একদিন কথায় কথায় আমার কাছে তার দুঃখের কথা বলছিলেন। কে যে আমার সঙ্গে একটা গোয়াল রেখে গেল, রিটায়ারমেন্ট অবধি বয়ে বেড়ালাম। অফিসফেরত রোজ এক লিটার দুধ কিনে ঘরে ঢুকতে হয়, বুঝলেন !

আমারই চারপাশে এইসব নিরীহ নামধারী মানুষ। তাদের দুঃখে আমারও মনটা দুঃখী হয়ে ওঠে। রাগ হয় সেইসব ব্যক্তিদের ওপর, নামকরণের দায়িত্বটি পালন করেছিলেন যাঁরা। তবে সেইসঙ্গে একটা ভয়ও এবার কাজ করছে। এই লেখায় যাঁদের নাম নিয়ে এত কথা লিখলাম তাঁরা যেন আমায় মার্জনা করেন। কাউকে অপমান করার জন্য কিছু বলিনি। এ নেহাতই নামকেত্তন। কেউ যদি এসবের জন্য রেগে গিয়ে আমায় মারধর করার কথা ভেবে বসেন তাহলে তো আপনি বাঁচলে বাপের নাম।

কে না জানে মারের নাম ধনঞ্জয়!

অঙ্কনঃ রাজ রায় 

Comments are closed.