বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

তরুণ মজুমদার : সাহিত্যের ভাষা সিনেমায়

তরুণ মজুমদার চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর নিজস্ব স্বভাব কখনও বিসর্জন দেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বর্তমান বাংলা ছবির অবাঞ্ছিত, অপসংস্কৃতি ট্রেন্ডের বিরুদ্ধে আপোসহীন ছিলেন।
চলচ্চিত্রকার হিসেবে তরুণ মজুমদার জনপ্রিয় ও সফল। তাঁর পরিচালিত প্রায় সব চলচ্চিত্রই দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিয়েছে।

বাবুল মণ্ডল

 

সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র একবার বলেছিলেন, “বাংলা ফিল্ম-শিল্পের উন্নতি করতে গেলে এখন সত্যিকারের প্রতিভার প্রয়োজন।” তাঁর এই কথা বোধহয় বঙ্গমাতা শুনেছিলেন। বিংশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এমন কয়েকজনের আবির্ভাব ঘটে যাঁরা পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গিয়ে তাকে বিশ্বমানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এঁরা হলেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, অজয় কর, তরুণ মজুমদার, রাজেন তরফদার, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তপন সিংহ প্রমুখ। এঁরা শিল্পগুণসম্পন্ন ও সুস্থ রুচির পরিচ্ছন্ন ছবি করে দেশ ও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও বাণিজ্যিক সাফল্য দুই-ই পেয়েছেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্র শতবর্ষ উত্তীর্ণ হয়েছে। এই একশো বছরের ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস অন্বেষণ করলে দেখতে পাওয়া যায়, যে বাঙালি পরিচালকদের কথা এখানে বলা হল তাঁদের অবদান ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রে স্মরণ করার মতো। এই বাঙালি পরিচালকরা একের পর এক বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া ও ইংরেজি ভাষায় চলচ্চিত্র পরিচালনা করে ভারতীয় চলচ্চিত্রে গৌরব বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তাঁদের নিপুণতায় ও কর্মদক্ষতায় বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। তবে অনেক খ্যাতনামা পরিচালকদের চলচ্চিত্র ও কর্মজীবন নিয়ে অনেকেই বিস্তৃত গবেষণামূলক কাজ করলেও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে মিতভাষী, আত্মপ্রচারবিমুখ পরিচালক তরুণ মজুমদারের কর্মজীবন তথা চলচ্চিত্র নিয়ে সঠিক মূল্যায়ন হয়নি।

তরুণ মজুমদার তাঁর চলচ্চিত্রগুলির উপাদান সাহিত্য থেকে নিয়ে তার মধ্যে ‘আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে’ নতুনভাবে দর্শকদের কাছে উপস্থাপিত করেছেন। প্রকৃতপক্ষেই তাঁর চলচ্চিত্র সাহিত্যের নবরূপায়ণ। আর তাঁর চলচ্চিত্রে আমরা পাই চলচ্চিত্র পরিচালনার স্বতন্ত্র ঘরানা। পরিচালনার প্রসঙ্গে তরুণ মজুমদার নিজেই লিখেছেন, “আমার উদ্দেশ্য হলো, সবাইকে ডেকে আমার মনের কথা জানানো। আমার সুখের কথা, দুঃখের কথা, অভিজ্ঞতার কথা, স্বপ্নের কথা— আমি আমার মতো করে তাঁদের কাছে বলতে চাই। বন্ধু যেমন বন্ধুকে বলে আপনজনের মতো।”  তাঁর এই উদ্দেশ্যকে তিনি সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন একের পর এক বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে।

তরুণ মজুমদারের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই সাহিত্যনির্ভর বা সাহিত্যকেন্দ্রিক। তিনি একদিকে যেমন সাহিত্যিক মনোজ বসু, বনফুল, বিমল কর, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ও সুবোধ ঘোষের গল্প-উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ করেছেন, তেমনই অন্যদিকে সাম্প্রতিককালের সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত প্রমুখের গল্প-উপন্যাসকেও চলচ্চিত্রে নবরূপায়িত করেছেন। এমনকি স্বল্প পরিচিত লেখকের গল্প নিয়েও সিনেমা তৈরি করে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। সেই লেখক হলেন বীরেন দাশ। গল্পের নাম ‘বৌরাণী’। সিনেমার নাম ‘কুহেলি’।

কুহেলি সিনেমার পোস্টার

তরুণ মজুমদারের সঙ্গে তাঁর সমসাময়িক পরিচালকদের গভীর হৃদ্যতার সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। সমকালীন পরিচালকরা তাঁকে ‘তনুবাবু’ নামে ডাকতেন। পরিচালক অজয় কর, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় (ঢুলুবাবু) রাজেন তরফদার থেকে শুরু করে বর্তমান যুগের পরিচালক গৌতম ঘোষ, সন্দীপ রায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে তরুণ মজুমদারের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। চলচ্চিত্র সমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্ত তপন সিংহ ও তরুণ মজুমদারের সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন, “Tapan Sinha and Tarun Majumdar are examples of talent within the ambit of commercial cinema and helped to bring a modicum of cinematic progress and economic viability to a handful of the regional products.”।

বয়সে প্রবীণ হলেও ছবি তৈরির কাজে উদ্যম ও আগ্রহের দিক থেকে গত ৪ জুলাই ২০২২ পর্যন্ত তরুণ ছিলেন তরুণই।

তরুণ মজুমদারের ছবি চলচ্চিত্রের ভাষা জানে আর জানে রুচিশীল বাঙালিকে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন বিষয় উপহার দিতে। তিনি নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি চান হল থেকে সিনেমা দেখে যখন মানুষ বের হবেন তাঁরা যেন ‘আর একটু ভালো মানুষ হয়ে বের হন’।

তরুণ মজুমদারের চিত্র পরিচালনার মূলে রয়েছে নান্দনিকতা ও পরিশীলিত রুচিবোধ। এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র সমালোচক সেবাব্রত গুপ্ত বলেছেন, “‘পথের পাঁচালী’-র পর যাঁরা চিত্রপরিচালনার কাজ করেছেন, তাঁরা কেউই সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি, তরুণও নন। তবু মনে হতে পারে, তরুণের চিত্রপরিচালনার শিকড় বুঝি গাড়া রয়েছে আরও আগের দিনের কিছু ছবিতে। নান্দনিক মেজাজ ও পরিশীলিত রুচিবোধ, বিনোদন-রীতির দিক থেকে দেবকী বসুর চলচ্চিত্রকর্মের সঙ্গে তরুণের ছবির মিল পাওয়া যায়। মানসিকতার দিক থেকে ওঁরা যেন একই ঘরানার চলচ্চিত্রকার। এস্‌থেটিক রস এবং লাবণ্যময়তা উভয়ের ছবির বিশেষ সম্পদ।”

বাঙালির যে গল্প বলার, গল্প শোনার ও গল্প লেখার সহজাত অধিকার আছে তাতে একটি বিধিসম্মত সিলমোহরের ছাপ দিয়েছিল নিউ থিয়েটার্স। তাঁর প্রতিটি ছবিতে এই সব কিছুরই সন্ধান দিয়েছেন পরিচালক তরুণ মজুমদার। চলচ্চিত্র সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “আমরা বাঙালিরা গল্প বলতে পারি আজকের বাংলা ছবি দেখলে হয়তো সে কথা পাগলের প্রলাপ বলে মনে হবে। মনে হবে বলেই তরুণ মজুমদারকে আমাদের এমন দ্বীপ মনে হয় যেখানে ‘তমালতালি বনরাজিনীলা’।” সেইজন্যেই তো “…তরুণবাবুর ছবিতে বিচিত্র স্পেকটেক্যাল থাকে না। দামি নায়ক-নায়িকাদের মিছিল থাকে না। এমনকি যে সব নাক উঁচু সমালোচক  তাঁকে শিল্পী ভাবতে দ্বিধাবোধ করে তারাও মেনে নিতে বাধ্য যে তিনি আমাদের সংস্কৃতিতে এমন এক কথকঠাকুর, জনপ্রিয়তার সরস্বতী যাঁর কণ্ঠে। আমাদের সাহিত্যে শঙ্কর, বিমল মিত্র বা বিমল কর আছেন। আমাদের চলচ্চিত্রে চলমান চিত্রমালায় তরুণ মজুমদার সেরকম কোনও শকুন্তলার আংটি পরে দর্শকের কাছে চিরদিনের জন্যে শনাক্ত।”

তরুণ মজুমদার একাধারে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, সংলাপ ও সঙ্গীত রচনা করেছেন। ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘চাওয়া পাওয়া’ (১৯৫৯), ‘স্মৃতিটুকু থাক’ (১৯৬০), ‘কাঁচের স্বর্গ’ (১৯৬২), ‘পলাতক’ (১৯৬৩) থেকে শুরু হয়েছিল। পরে এককভাবে পরিচালিত ‘আলোর পিপাসা’ (১৯৬৫) থেকে শুরু ‘ভালবাসার বাড়ি’ (২০১৮) পর্যন্ত ২৯টি বাংলা পূর্ণাঙ্গ ছবির মধ্যে ১০টির কাহিনি তিনি নিজেই রচনা করেছেন। এর প্রায় সবক’টিই বাণিজ্যসফল চলচ্চিত্র।

বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে তরুণ মজুমদার বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি যেসব অবদান রেখে গেলেন—

বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি রুচিশীল, সংস্কৃতিমনস্ক, সুস্থ ছবি উপহার দিয়েছেন।

‘দাদার কীর্তি’ র একটি মুহূর্ত

তাঁর ছবি পরিচালনার মূল বিশেষত্ব, বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন সাহিত্যিকের গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবি।

তাঁর নির্মিত ছবিতে রয়েছে বাংলার মাটির গন্ধ।

তরুণ মজুমদার তথাকথিত আর্ট ফিল্ম না করেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকের কথা মাথায় রেখে কাজ করতেন। ফলে তাঁর পরিচালনার জাদুতে আকৃষ্ট হয়ে শিক্ষিত চিত্রমোদীরা ‘তরুণ মজুমদার’ নামটি দেখেই সিনেমা হলে ভিড় জমাতেন। কিছু জনপ্রিয় বিনোদন-ফর্মুলা দিয়েও ছবি সফল করানো যায়। যাঁরা এই ফর্মুলাগুলো সঠিক প্রয়োগ করতে পারেন তাঁদের নামেও ছবি চলে। সেটা আসলে ফর্মুলারই জয়, পরিচালকের নয়। তরুণ মজুমদারের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা একেবারেই ভিন্নরকম। তিনি সাহিত্যের কাহিনি নিয়ে, তার সঙ্গে বিচিত্র ধরনের গল্প খুঁজে নিজ দক্ষতা ও অনুরাগী মন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাঙালি তথা ভারতবাসীর মন জয় করেছেন।

সাহিত্যের রসের সঙ্গে ফিল্ম আর্টের কিছু লক্ষণও তিনি তাঁর ছবিতে রেখেছেন। তরুণ মজুমদারের চলচ্চিত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এইখানেই। শিল্প বিচারে তরুণ মজুমদারের চলচ্চিত্র যেমন ‘বালিকা বধূ’, ‘সংসার সীমান্তে’ কিংবা ‘গণদেবতা’-কে দেখলে তরুণ মজুমদারের এইসব অসাধারণ সিনেমাগুলোকে মধ্যম পর্যায়ের সিনেমার পর্যায়ভুক্ত বলতে পারেন কেউ। যা আর্ট ফিল্মের নীচে এবং মেইন স্ট্রিমের ওপরে। কিন্তু তরুণ মজুমদারের ছবিকে এরকম কোনও তকমা দেওয়া যায় না। তাই সমালোচক সেবাব্রত গুপ্ত বলেছেন, “…তরুণের ছবি তাঁর নিজের ধারারই ছবি, একেবারেই তাঁর নিজস্ব শিল্পকৃতি।”

সিনেমায় কবিতা বলার মতো ক্যামেরাকে ব্যবহার করতেন এই পরিচালক। যেখানে দৃশ্য শুধু দৃশ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এক সূক্ষ্ম বাস্তবতার আভাস দিতেন তাঁর চলচ্চিত্রের দৃশ্যে।

তরুণ মজুমদার চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর নিজস্ব স্বভাব কখনও বিসর্জন দেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বর্তমান বাংলা ছবির অবাঞ্ছিত, অপসংস্কৃতি ট্রেন্ডের বিরুদ্ধে আপোসহীন ছিলেন।

চলচ্চিত্রকার হিসেবে তরুণ মজুমদার জনপ্রিয় ও সফল। তাঁর পরিচালিত প্রায় সব চলচ্চিত্রই দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিয়েছে।

তাঁর চলচ্চিত্রগুলির শিল্পমূল্য সর্বজনস্বীকৃত। অভিনেত্রী-পরিচালক অপর্ণা সেন তাই বলেছেন, “বাণিজ্যিক দিক থেকে তিনি সফল তো বটেই— বাংলা ছবির জগতে যাঁরা এক সময়ে স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিলেন, তরুণ মজুমদার তাঁদের মধ্যে অন্যতম…।”

নিজ কৃতিত্বের সাক্ষর হিসেবে তরুণ মজুমদার সুদীর্ঘ ছয় দশক ধরে (১৯৫৯-২০২২) দর্শকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছেন। দর্শকদের হৃদয় জয় করতে তিনি সফল, আবার সমালোচকের অকুণ্ঠ প্রশংসাও পেয়েছেন।

তরুণ মজুমদার যে সমস্ত জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কার তথা সম্মান লাভ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে ‘কাঁচের স্বর্গ’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট ফিচার ফিল্ম ইন বেঙ্গলি’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার, ১৯৬৪।

‘নিমন্ত্রণ’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট ফিচার ফিল্ম ইন বেঙ্গলি’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার, ১৯৭৪।

‘গণদেবতা’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট পপুলার ফিল্ম প্রোভাইডিং হোলসাম এন্টারটেইনমেন্ট’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার, ১৯৭৯।

‘গণদেবতা’ চলচ্চিত্রে সন্ধ্যা রায়

‘অরণ্য আমার’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট সায়েন্টিফিক ফিল্ম’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার, ১৯৮৭।

‘আলো’ চলচ্চিত্রটি ‘বেস্ট পপুলার ফিল্ম প্রোভাইডিং হোলসাম এন্টারটেইনমেন্ট’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কারের জন্য নমিনেটেড হয় ২০০৩ সালে।

‘নিমন্ত্রণ’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট ডিরেক্টর’ হিসেবে বেঙ্গলি ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (BFJA) পুরস্কার, ১৯৭২।

‘সংসার সীমান্তে’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট ডিরেক্টর’ হিসেবে বেঙ্গলি ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (BFJA) পুরস্কার, ১৯৭৬।

‘ভালবাসার অনেক নাম’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘বেস্ট ইণ্ডিয়ান ফিল্ম’ হিসেবে বেঙ্গলি ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (BFJA) পুরস্কার, ২০০৭।

‘আলো’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘আনন্দলোক’-এর ‘বেস্ট ফিল্ম’ পুরস্কার, ২০০৪।

‘কলাকার পুরস্কার’, ২০০৪।

ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হন ১৯৯০ সালে। স্বর্ণকমল পেয়ে জাতীয় সম্মানের অধিকারী হন তিনি।

তরুণ মজুমদারের ছবি কেবল আঞ্চলিক ও জাতীয় পুরস্কারই পায়নি। পেয়েছে কোটি কোটি বাঙালি তথা ভারতীয় দর্শকের প্রশংসা ও অভিনন্দন, যা একজন পরিচালকের কাছে চির আকাঙ্ক্ষার ও প্রত্যাশার বিষয়।  বলা ভাল, বাংলা চলচ্চিত্রের পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে তিনি একজন।

বাংলা ছাড়াও তিনটি হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তরুণ মজুমদার। মনোজ বসুর ‘আংটি চাটুজ্জের ভাই’ গল্প অবলম্বনে ১৯৬৯ সালে বাংলা ‘পলাতক’ ছবির হিন্দি রিমেক ‘রাহগীর’ নির্মাণ করেন। বিমল করের ‘বালিকা বধূ’ উপন্যাস অবলম্বনে বাংলা ‘বালিকা বধূ’ ছবির হিন্দি রিমেক ‘বালিকা বধূ’ নির্মাণ করেন ১৯৭৬ সালে। মহাশ্বেতা দেবীর ‘রুদালি’ নাটক অবলম্বনে হিন্দি ছবি ‘রুদালি’ নির্মাণ করেন। এছাড়া বাংলা চলচ্চিত্র ‘কথা ছিল’ তিনি ওড়িয়া ভাষায় নির্মাণ করেন, যার নাম ‘আকুয়া কথা’ (১৯৯৪)।

তিনি বেশ কিছু তথ্যচিত্র ও টেলি-ধারাবাহিকও নির্মাণ করেছেন। তথ্যচিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ২০০১ সালে ‘রাঙামাটির পথ’, ২০০৫ সালে ‘ও আমার দেশের মাটি’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ টেলিধারাবাহিক পরিচালনা করেন ২০১৪-২০১৫ সময়কাল পর্যন্ত।

তাঁর চলচ্চিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, প্রচলিত ও স্বরচিত গান ব্যবহার, যা বাংলা চলচ্চিত্রের এক আলাদা প্রাপ্তি। গান নিয়ে সিনেমায় নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন তিনি। গান তাঁর চলচ্চিত্রের অত্যাবশকীয় অংশ।

তরুণ মজুমদারকে নিয়ে তেমন আলোচনা বা প্রচার হয়নি। আসলে আত্মপ্রচারবিমুখ, আত্মমগ্ন শিল্পী বলেই তরুণ মজুমদার প্রায় নেপথ্যেই থেকে গেছেন। তবে এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যেতে পারে, রুচিশীল, সংস্কৃতিমনস্ক, সাহিত্যানুরাগী বাঙালি দর্শক তাঁকে চিরদিন মনে রাখবে। মূল্যবোধ আর হৃদয় দিয়ে তিনি তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এখানেই পরিচালক হিসেবে তিনি সার্থক ও স্মরণীয়।

 

তথ্যঋণ :
১) ‘কেমন ছবি করতে চাই’— তরুণ মজুমদার, ‘শতবর্ষে চলচ্চিত্র’ (নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত) প্রথম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্রথম সংস্করণ এপ্রিল ১৯৯৬, দ্বিতীয় মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ২৬।
২) ‘ভারতে চলচ্চিত্র’, নলিনী রায়, ‘বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্রচর্চা’ (সংকলক ও সম্পাদক দেবীপ্রসাদ ঘোষ), প্রথম খণ্ড, প্রতিভাস, প্রথম প্রতিভাস সংস্করণ সেপ্টেম্বর ২০১১, পৃষ্ঠা ৬৭।
৩) ‘শতবর্ষে চলচ্চিত্র’, (নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত), প্রথম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, প্রথম সংস্করণ-এপ্রিল ১৯৯৬, দ্বিতীয় মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৪৩১।
৪) ‘চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজস্ব স্বভাব কখনও বিসর্জন দেননি’— সেবাব্রত গুপ্ত। ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল সম্পাদিত ‘বৈশাখী’ পত্রিকা’, তরুণ মজুমদার বিশেষ সংখ্যা, ২০০৬, পৃষ্ঠা ১১।
৫) ‘যে আখ্যান তারুণ্যমণ্ডিত’— সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল সম্পাদিত ‘বৈশাখী’ পত্রিকা, তরুণ মজুমদার বিশেষ সংখ্যা, ২০০৬, পৃষ্ঠা ১৫।
৬) ‘চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজস্ব স্বভাব কখনও বিসর্জন দেননি’—সেবাব্রত গুপ্ত। ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল সম্পাদিত ‘বৈশাখী পত্রিকা’, তরুণ মজুমদার বিশেষ সংখ্যা, ২০০৬,  পৃষ্ঠা ১২।
৭) ‘তরুণ মজুমদারের সিনেমা’— অপর্ণা সেন। ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল সম্পাদিত ‘বৈশাখী’ পত্রিকা’, তরুণ মজুমদার বিশেষ সংখ্যা, ২০০৬, পৃষ্ঠা ১৬-১৭।
৮) ’১৬ আনা বাঙালিয়ানা’— বিশ্বজীবন মজুমদার। ৩০ জুন ২০১৫, তরুণ মজুমদারের পরিচালক জীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্বর্ধনা সভার বক্তব্য। ইউটিঊব ভিডিও থেকে অনুলিখন।

Comments are closed.