বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

পলাশের রঙে

ঠাকুমা বুঝতেই চাননি যে পদবিটা জন্মের পর পায় মানুষ। পদবি মানুষকে অশুচি করে কী করে?

কল্যাণ সেনগুপ্ত

 

এইচ আর-এর ঘরে ঢুকে মুখের দিকে তাকিয়ে  বিতানের নতুন চাকরির প্রথম দিনের উৎকণ্ঠা একনিমেষে মিলিয়ে যায়।  কিছুক্ষণ লাগে ধাতস্থ হতে। আরে! খুশি ছড়িয়ে পড়ে মুখে। এ কাকে দেখছে!

“পারমিতাদি! তুমি? এখানে কী করে?”

পারমিতাও অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তার পর  একমুখ হাসি দিয়ে বলল, “আমি তো  এই কোম্পানিতে প্রায় চার বছর হল। তুমি কি আজ জয়েন করতে? তোমার সঙ্গে এরকম জায়গায় দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি। দ্যাখো কী যোগাযোগ।”

খুব শুষ্ক লাগছে পারমিতাদিকে। কেমন একটা ক্লান্ত ছাপ মুখে। কোনও অলংকার নেই কানে, গলায়। সাদা-কালো ছোপ ছোপ সিল্কের একটা শাড়ি পরা। একসময় ফর্সা, দারুণ সুন্দরী ছিল। বেশ ছিপছিপে। এখন অনেকটা ভরাট শরীর। কিন্তু চেহারার আভিজাত্য এখনও অটুট। চোখের দৃষ্টিতে একটা স্নিগ্ধতার স্পর্শ।

বিতান নিজের কাগজপত্রগুলো এগিয়ে দিয়ে বলল, “তোমাকে এখানে দেখতে পাব একদম  ভাবিনি। নতুন অফিসে প্রথম দিন, বুঝতেই পারছ, একটু টেনশনে ছিলাম।”

পারমিতা একটা ফর্ম এগিয়ে দিয়ে বলে, “এটা ভর্তি করো।” বলে একটা পেন এগিয়ে দেয়।

বিতান বলল, “তুমি তো জানি দিল্লি ছিলে। কবে কলকাতায় এলে?”

“চা খাবে?” বলে ফোন তুলতে তুলতে পারমিতা বলে, “এই মাস ছয়েক ফিরেছি এই ব্রাঞ্চে।”

বিতানের বিস্ময় যায় না। ফর্ম না  ভরে তাকিয়েই থাকে। বলে, “কোথায় আছ?”

“কেন বাড়িতে। ভবানীপুরের বাড়ি। তুমি তো চেন।”

ফর্ম ভরতে ভরতে মনের গহীনে পারমিতাদিকে নিয়ে স্মৃতিগুলো আবার ভেসে উঠতে থাকে। সংবিত ফেরে পারমিতা রায়ের কথায়। “আরও অনেকগুলো ফর্ম ফিল আপ করতে হবে। লিখে ফেলো চটপট।”
বিতান খেয়াল করল পারমিতাদির মুখে বিতানকে দেখে কোনও অস্বস্তির ছাপ নেই। খুব যেন স্বাভাবিক।

ডিপার্টমেন্ট হেডের কাছ ঘুরে বিতান নিজের জায়গায় বসল। পাশে সহকর্মীরা বসে আছে। সবাই আড়চোখে বিতানকে দেখছে।

আস্তে আস্তে বিতান কাজের জগতে নিজেকে মেলতে থাকে। আসতে-যেতে অফিসে বেশ কয়েক বার  পারমিতাদির সঙ্গে দেখা হয়েছে। প্রতিবারই আন্তরিকভাবে হেসেছে বা দূর থেকে হাত নেড়েছে। কিন্তু একবারও নিজে থেকে বিতান ও তাদের বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করেনি।

দু-চার দিন পর লাঞ্চরুমে বিতান  অনেকটা দেরি করে এসে দেখল ঘরের এককোনায় পারমিতাদি একা বসে টিফিন খাচ্ছে। বিতান হেসে উল্টো দিকে বসে বলল,  “এতদিনে তোমাকে ফ্রি পেয়েছি। কেমন আছ?”

“ভালই তো চলছে।”

“তোমায় একটা কথা বলব?”

“বলো।”

“বাড়িতে তোমার কথা কখনও আলোচনা হয় না। আমি তো দাদার থেকে সাত বছরের ছোট। তুমি দাদার আর তোমার কথা একটু বলবে? আমাকে কেউ প্রায় কিছুই বলে না। আর তখন আমি অনেক কিছুই বুঝিনি।”

পারমিতাদি বলল, “কতদিন আগের কথা। ছেড়ে দাও না।”

বিতান জোর দিয়ে বলে, “আমাকে জানতে হবে।”

“বলো কি জানতে চাও।”

“তোমার সঙ্গে কী করে আলাপ দাদার?”

“অনেকেরই যেমন হয়। কলেজের নাটক প্রতিযোগিতায়। প্রেম-ভালবাসা থেকে অনেক দূরের মানুষ আমি। কিন্তু তোমার দাদাকে কিছু দিন দেখার পর মনে হল এই মানুষটাই আমার নিজের। চিন্তাভাবনা, ভবিষ্যৎ দেখা, স্বপ্ন দেখা— সব তার আমার মতো। বন্ধু অনেক ছিল কিন্তু হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, তোমার দাদার সঙ্গে থাকলে আমি অজানা এক আনন্দে ভেসে যাই। লজ্জা, আনন্দ মিশ্রিত একটা ভাললাগা জড়িয়ে  থাকে, যতক্ষণ ও থাকে। অনেককে ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে। ওকে দেখলে বুকের মধ্যে কেমন  শব্দ। কথা জড়িয়ে যাওয়া…”

বিতান বলল, “দাদা তোমায় প্রপোজ করেছিল?”

পারমিতাদি কপালের চুল সরিয়ে হেসে উঠল। গালে এখনও টোল পড়ে হাসলে। এখনও চোখ হাসে। বলল, “এই ব্যাপারটা এখন হয়েছে। বিদেশি কালচার। তখন মুহূর্তগুলো চলে যাচ্ছিল। আমরা পরস্পরের দিকে নিষ্পলক। কিছুই বলছি না। কী করে যেন ভগবান ওর সঙ্গে আমাকে জুড়ে দিয়েছেন। মিলন আছে, বিচ্ছেদ নেই। আমরা কোনওদিন মুখে বলিনি আমি তোমার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাই। আমি যেমন নিজের শরীরকে ভালবাসি তেমনি পলাশও আমার ভেতরে মিশে আছে।”

“তোমাদের বিয়েটা হল না কেন?”

“থাক বিতান। ওসব কথা আমি আর মনে রাখতে চাই না।”

“আমাদের বাড়ি, তোমাদের বাড়ির কি আপত্তি ছিল?”

“আমার বাড়িতে তেমন আপত্তি ছিল না।”

“তুমি বিয়ে করে নিলে না কেন?”

“তাতে কী হত?”

“তোমাকে মানতে ওরা বাধ্য হত।”

“আমরা কেউই কোনও বাধ্যবাধকতার মধ্যে ছিলাম না। বিয়ে করার কথাও কোনওদিন বলিনি। তোমাদের ঠাকুমা প্রথম ভাগাভাগিটা করল। তবে  তোমার দাদাকে কি ধরে রাখতে পারলাম? হয়নি একদিকে ভালই হয়েছে। হলে প্রচুর বাধা এসে দাড়াঁত। এই করবে না, ওই করবে না। বিধবার নিয়মকানুন জারি করত হয়তো।”

বিতান বলল, “তখন আমি স্কুলের শেষের দিকে। দাদার সঙ্গে কেমোথেরাপি দিতে তুমি যেতে। কিন্তু বাড়িতে ঢুকতে না। বাইরে অপেক্ষা করতে। কেন? আমাদের বাড়িতে কেউ তোমায় মানা করেছিল আসতে? এসব প্রশ্ন আমার মাথায় ঘোরে।”

“প্রথম কেমোর সময়, পরে ঠাকুরপুকুর হাসপাতালে এক মাস  রোজ গেছি। আস্তে আস্তে কষ্টে কেমন করে একটা মানুষ চলে যেতে পারে দেখলাম। তখন বয়েসই বা কত?  আমার চব্বিশ-পঁচিশ হবে। তোমার দাদা অনেকবার বলেছে, রোজ আসার কী দরকার। আমি তো ভালই আছি। কিন্তু ওই। খালি মনে হত আমি বাড়িতে খাটে শুয়ে ঘুমাচ্ছি আর ও হাসপাতালের বেডে কষ্ট পাচ্ছে, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। সেটা দেখা বরং সোজা। দূরে থাকলে নিজের কষ্ট বেশি হয়, চিন্তা আরও বেশি হয়। তাই যেতাম।”

“তার পর?”

“তোমার দাদাকে শেষ অবস্থায় বাড়ি আনা হয়।”

“হ্যাঁ, সে তো দেখেছি। তার দু’দিন পরেই দাদা চলে গেল সবাইকে ছেড়ে।”

“আমি ওই শেষ দু’দিন তোমার দাদাকে দেখিনি।” গলা জড়িয়ে এল পারমিতার।

“কেন, বাড়িতে ছিল বলে?”

“আমার যেতে ইচ্ছে করেনি। ওই কষ্ট আর দেখা যাচ্ছিল না। শেষ দেখা দেখতে বুক বেঁধে  শ্মশানে গেছিলাম। তখন তোমার দাদা চন্দন মালা গলায় অচেনা মানুষ।”

এই অবধি বলে পারমিতাদি উঠল। “প্রচুর কাজ পড়ে আছে। পরে কথা হবে।”

***

পরে আবার একদিন ওই লাঞ্চ রুমেই দেখা হল। বিতানের জানা শেষ হয়নি। সেদিন আবার সে পুরনো কথায় ফেরে। বলে, “তোমার কোনও চাওয়া ছিল না দাদার কাছে? স্বীকৃতি?”

পারমিতাদি বলল, “বিয়ে বলতে যে আগুন, যে শালগ্রাম লাগে, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের উপস্থিতি লাগে, সেরকম তো আমাদের কিছুই হয়নি। যখন তোমার দাদার ক্যানসার ধরা পড়ে তার পর থেকে যে তিনটে মাস সে ছিল, তখনই তো  জানি তাকে ছেড়ে দিতে হবে। পূর্ণ সংসার হবার আগেই শেষ হয়ে যাবে। তোমরা ব্রাহ্মণ আর  আমরা সাহা বলে…। প্রথম থেকেই তোমার ঠাকুমা, তোমাদের বাড়ি…”


কথা শেষ করতে পারে না পারমিতা।  একটু থেমে বলে, “প্রথম প্রথম যখন তোমাদের বাড়ি গেছি তখন এই বাছবিচার তেমন কিছু ছিল না। তোমার দাদা বোধহয় বাড়িতে আমাদের ভালবাসার কথা বলেছিল। তার পরই  রাতারাতি  সব পাল্টে যায়।”

বিতান বলে, “শুনেছি ঠাকুমার প্রবল প্রতাপ ছিল বাড়িতে। কাকা, বাবা, পিসির কোনও কথাই চলত না। তোমায় নিয়ে কী বলেছিল?”

“ঠাকুমা ওকে বলেছিল আমাকে নিয়ে যেতে। আমি গেছিলাম। যখন শুনলেন আমার পদবি  তখনই বললেন, এ বিয়ে  কিন্তু হবে না। আমার ঠাকুরঘর আছে, নিত্যপুজো হয় গোপালের, ভোগ হয়। আমি তোমাকে ঘরে নিতে পারব না।”

“বাবা, মা, কাকা, পিসি কিছু বলেনি?”

পারমিতা বলল, “তোমার বাবা বলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কঠিন দৃষ্টিতে তাঁকে ভর্ৎসনা করে নিজের ঠাকুরঘরে ঢুকে যান  ঠাকুমা। দু’দিন মেসোমশাইয়ের  সঙ্গে কথা বলেননি। তার পর যখন  তোমার দাদার লিভার ক্যানসার ধরা পড়ে তখন বাড়িতে একটা হাওয়া ওঠে যে তোমার দাদার জন্যে আমি অপয়া। তাতেই সবাই গুটিয়ে যায়।”

বিতান বলল, “এটা ঠাকুমাই ছড়িয়েছিল। এরকম হয় এই সময়ে? এ তো  সাংঘাতিক অন্যায়। আমি একটু বড় হওয়ার পর মা বলেছিল। মায়ের ভীষণ খারাপ লেগেছিল। বাবা আর ঠাকুমা চলে গেল। এত বছর বাদে তোমার সঙ্গে দেখা হল। মা একদিন বলেছে তোমাকে একবার নিয়ে যেতে। তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চায়।” একদমে এতটা বলে বিতান বলে, “একদিন যাবে পারমিতাদি?”

পারমিতা মুখ নিচু করে বলল, “যাব একদিন। তবে যাকে ঘিরে সম্পর্ক সেই যখন নেই তখন…”

বিতান বলল, “প্লিজ, না কোরো না।”

“ঠিক আছে। তোমার মা যখন বলেছেন, যাব।”

***

 

বাড়িতে ভাই, ছোটপিসি কেউ নেই। শুধু মা। পারমিতা বিতানের সঙ্গে ঢুকল। খুব জড়সড় হয়ে আছে। এতবছর বাদে একটু বাধো বাধো লাগছে, বুঝতে পারছে বিতান। বিতানের মা মিনতি নীচের ঘরেই থাকেন। পারমিতা ঢুকতেই ওঁর মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এসো, এসো পারমিতা। অনেকদিন পর। বসো, বসো আমার পাশে। দেখি একটু তোমায়।”

পারমিতা দাঁড়িয়ে রইল। বিতানের মা কাছে আসার পর প্রণাম করল। মিনতি তাকে ধরে খাটের পাশে বসিয়ে দিলেন। পারমিতা বলল, “কেমন আছেন মাসিমা?”

মিনতির গলাটা কেঁপে গেল। ছেলের স্মৃতি ভেসে উঠল পারমিতার উপস্থিতিতে। উঠে আসা কান্না থামিয়ে বললেন, “ভালই আছি। তোমার কথা বিতানের মুখে শোনা থেকেই তোমাকে দেখতে চাইছিলাম।”
পারমিতা বলল, “আপনার কোমরের ব্যথা শুনেছিলাম। কেমন এখন? উঠে দাঁড়াতে কোনও অসুবিধা হল না? আমি তো শুনলাম আপনি শয্যাগত।”

পারমিতার কাঁধে হাত রেখে মিনতি শুষ্ক হাসলেন। বললেন, “তুমি আসছ, আমি শুয়ে-বসে থাকতে পারি? তোমার সঙ্গে অনেক কথা জমে আছে আমার। আমাকে তো উঠে দাঁড়াতেই হবে।”

পারমিতা মাথা নিচু করে রইল। বিতান দূরে দাঁড়িয়ে। পারমিতা বলল, “বিতান, তুমিও বসো।”

বিতান বসল না। মিনতি পারমিতার খোঁজখবর, চাকরি, স্বাস্থ্য সব জেনে নিয়ে বললেন, “তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”

একটু অবাক দৃষ্টিতে পারমিতা চেয়ে রইল। এতদিন বাদে কি এমন কথা থাকতে পারে?

মিনতি বললেন, “তোমার প্রতি আমার শাশুড়ি অন্যায় করেছিলেন। উনি আজ নেই। আমার স্বামীও নেই। সেই অন্যায়টা আমি মানিনি। কিন্তু তোমায় বলতেই পারিনি।”

পারমিতা মিনতির হাতটা চেপে ধরে বলল, “থাক না মাসিমা। এতদিন বাদে এসব কথার আর কী দরকার? যাকে ঘিরে এত কিছু, সে-ই  তো নেই।”

মিনতি বললেন, “দ্যাখো,  আমার ঘরে কোনও ঠাকুর-দেবতার ছবি নেই। আমি ধর্ম, জাতপাত কিছুই মানি না। কিন্তু শাশুড়ি ভীষণভাবে মানতেন  উঁচু-নিচু। আর আমার স্বামীর শাশুড়ির কথার কোনও অন্যথা করবার সাধ্য ছিল না।”

পারমিতা চুপ করে রইল। পুরনো কষ্ট নিয়ে কাঁটাছেড়া ভাল লাগে না। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে রইল।

মিনতি  পারমিতার কাছে জানতে চাইলেন, “তুমি বিয়ে করেছ?”

পারমিতা বলল, “দরকার মনে হয়নি।”

“কে কে আছে বাড়িতে?”

“মা, দাদা-বউদি আর ভাইপো কুটুস।”

“শেষ বয়সের কথা ভাব?”

মাথা নাড়ল পারমিতা। ইচ্ছে করছে না উত্তর দিতে, তবু বলল, “ও চলে যাবে। কিছুই তো থেমে থাকে না মাসিমা। কেউ পড়ে থাকে না। একজন বিধবা বয়সকালে কীভাবে কাটাবে, সমাজ সেটা কি ভাবে? তার ওপর সে যদি নিচু জাতের হয়?”

“নাহ্‌! তুমি সেই শাশুড়ির কথা ধরে রেখেছ।”

“মাসিমা, আপনাকে বললে কি  আপনি যাকে-তাকে পোষ্য নিতে পারেন? আসলে কিছুই পাল্টায়নি। এটাই বড় আফশোস। কবে পাল্টাবে কে জানে।”

“একটু দাঁড়াও। আসছি।”

মিনতি উঠে গিয়ে দেরাজ খুললেন। একটা লকেট দেওয়া সরু সোনার হার নিয়ে এলেন। পারমিতার কাছে এসে বললেন, “পারমিতা, এই হারটা তোমার। আমি আর আমার স্বামী এটা তোমার জন্যে করে রেখেছিলাম। অনেক দিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি। তুমি কলকাতায় ফিরে এসেছ, বিতানের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তার পর থেকেই অপেক্ষায় আছি কবে তোমাকে এটা দিয়ে যাব।”

পারমিতা ইতস্তত করে  সেটা হাতে নিল । বলল, “মাসিমা, হারটা খুব সুন্দর। আপনি এতদিন ধরে আমার জন্যে রেখেছেন, আমি আপ্লুত। কিন্তু এ আমি নিতে পারব না।”

“কেন? কেন পারবে না? আমি ভালবেসে তোমায় দিচ্ছি। আমি পলাশের মা। আমি কিছু দিলে নেবে না?”

“এ হার আমি কেমন করে নেব? আর কোনও দাবিই তো আমার নেই। কোনওদিনই ছিল না।”

“এই বাড়ির বউ হিসেবে তোমার জন্যে রেখেছি আমরা। তুমি নাও।”

“না মাসিমা। এটা আমি নিতে পারব না। যেদিন পরিয়ে দিলে নিতাম সেদিন কবে ভেসে গেছে। আপনি এটা রেখে দিন । বিতানের বউকে দেবেন আমার হয়ে।”

সেদিন পারমিতা তার পরও অনেকক্ষণ বসে ছিল। দাদার ঘর এখন বিতানের। সেটাও দেখল। দেওয়ালে দাদার একটা ছবি দেখে হঠাৎ মজার ছলে বলল, “তোমাদের কাছে শুধু দাদার ছবি। আমার কাছে আমাদের দু’জনের ছবি আছে যা তোমাদের নেই।”

***

গা কাঁপিয়ে জ্বর এল বিতানের রাতে। সঙ্গে গলায় ব্যথা। ডাক্তার বললেন কোভিড টেস্ট করানো দরকার। টেস্ট হল। পজিটিভ আসেনি তবু ডাক্তার বললেন “ঘর থেকে বেরোবেন না।”
দিন দশ অফিসে যাওয়া হয়নি বিতানের। প্রথম যেদিন অফিসে গেল, শরীর বেশ দুর্বল।
অফিসের গ্রুপ ডি স্টাফ সুদেশ জিজ্ঞাসা করলেন, “পেয়েছেন দাদা এইচ আর ম্যাডামের চিঠি?  ওই যে, চাপা দিয়ে রেখে গেছি।”

খামটা খুলতেই  দুটো কাগজ বেরিয়ে এল। একটা সাদা কাগজে কয়েক লাইন লেখা। আর কোনও একটা সার্টিফিকেট। চিঠিটা পড়ল বিতান।

প্রিয় বিতান

কলকাতায় আসতে চাইনি। অফিসের খুব দরকার বলে এসেছিলাম। বেদনার স্মৃতি থেকে আবার  ক্ষরণ হচ্ছে যন্ত্রণা। দিল্লি ফিরে যাচ্ছি। আমি পলাশেই পূর্ণ আছি। বাকি জীবনটা মনে হয় অসুবিধা হবে না। প্রেম-ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের পরেও আরেকটা পর্ব আছে। সেটা বিশ্বাস আর সমর্পণের মধ্যে বেঁচে থাকে। পলাশ কিন্তু এখনও তোমাদের কাছে যত না আছে তার থেকে বেশি আছে আমার নিশ্বাসে, হৃদয়ে।

মাসিমার দেওয়া  সোনার হারটা নিতে পারিনি, ওটাতে সম্পর্কের গন্ধ ছিল। আমি তো কিছুই চাইনি। ভাল থেকো। তোমার বিয়ের সময় খবর দিয়ো। খুব চেষ্টা করব আসতে। আসলে  আগুন, সার্টিফিকেট, শালগ্রাম শিলা কিছুই  লাগে  না। লাগে পরস্পরের বিশ্বাস আর সম্মান। তবু তোমার দাদার অনুরোধে একটা ম্যারেজ সার্টিফিকেট  করে রেখেছিলাম বিদেশ যাবার চেষ্টায়। তারই একটা কপি পাঠালাম। যদিও আমি এগুলোকে বিশ্বাস করি না। সব শেষে বলি, এখন তো তোমার দাদা নেই কিন্তু আমি এইভাবেই তোমার দাদাকে নিয়ে চলতে শিখেছি। জীবন তাই শিখিয়েছে। এই সার্টিফিকেটটা দয়া করে আর  কাউকে দেখিয়ো না। ভালবাসা নিয়ো।

পারমিতাদি।

চিঠিটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে রইল বিতান। এমন ভালবাসাও হয়? রিক্ততার মধ্যে, নিঃস্বতার মধ্যেও বেঁচে থাকে? সম্পর্কের দাবি করে না? দাদা চলে যাওয়ার দুঃখ কষ্ট এখন অনেকটা অস্পষ্ট। পারমিতাদি সামান্য কয়েকটা বছরের জীবনের  পরিচয়কেই বুকে করে চলছে। ঠাকুমা  বুঝতেই চাননি যে পদবিটা জন্মের পর পায় মানুষ। পদবি মানুষকে অশুচি করে কী করে?
এমন কোনও শক্তি নেই যে ওদের  ভালবাসাকে আলাদা করতে পারে। ওরা জীবনভর বেঁচে থাকবে বিতানের মতো আর একটা মানুষকে উজ্জীবিত করার জন্যে।

অঙ্কনঃ রাজ রায় 
1 Comment
  1. স্বপন নাগ says

    মর্মস্পর্শী এ গল্প মনে থাকবে অনেক দিন।

Comments are closed.