বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

আগামীকাল

গৌর বৈরাগী

 

গগনবাবু রোজ মর্নিং ওয়াকে বেরোন। তার বাড়ির কাছেই নির্জন এই দিঘিটা। বিশাল  জলাশয়ই বলা যায়। গাছপালা ঘেরা এই দিঘির চারপাশে একপাক ঘুরতে তার সময় লাগে ছ’মিনিট তেরো সেকেন্ড। রোজই তিনি ছ’পাক ঘুরে আসেন।  চারপাশের পরিবেশ বড় সুন্দর লাগে তার। দিঘিটার ধারে ধারে ক’টা কৃষ্ণচূড়ায় ঝাঁপিয়ে ফুল এসেছে। লাল ফুলগুলোর শরীরে কেমন চমৎকার কোমল আভা। নিশিকান্তবাবুর পাঁচিলের ভেতরে গন্ধরাজ গাছে অজস্র ফুল ফুটেছে। গন্ধরাজ অকাতরে গন্ধ বিলিয়ে দিচ্ছে। বিনা পয়সায় এই গন্ধ বুক ভরে টেনে নেন গগনবাবু। তখন তার বেশ কষ্ট হয়। প্রকৃতির সাজিয়ে দেওয়া এই মন ভাল করা পরিবেশে কেউ মন ভাল করতে আসে না। রাত তিনটেতে নাকি আজকাল লোকে ঘুমোতে যায়। তার আগে কত কাজ। টিভিতে একা একা মুভি দেখে, কম্পিউটারে গেম খেলে, আবার রাত জেগে খেলা দেখা আছে। বই পড়ার অভ্যেস থাকতে পারে কারও কারও। এইসব নামীদামি কাজ মেটানোর পর যদি হাতে সময় থাকে তখন ঘুমকে নামতে দেওয়া হয় চোখের পাতায়। এই সময় ডাকাডাকি করলে কেউ কেউ বলে, মহার্ঘ ঘুম মাটি করে আপনার প্রকৃতি-ফ্রকৃতি দেখতে আমার বয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ আছে যেমন, ঘনশ্যাম সরকার। মানুষটা সকালে উঠে ঝগড়া শুরু করে। নিবারণ দাস  টোটো নিয়ে সোজা মানকুন্ডু চলে যায়। সেকেন্ড ট্রেনের প্যাসেঞ্জার তার বাঁধা। নিখিলানন্দ ভোরের বাতাসে নামগান গাইতে গাইতে গঙ্গা চানে যান। তাই কারও আসা না আসার ব্যাপারে গগনবাবুর কোনও আগ্রহ নেই। তিনি একা একা ঘোরেন। একা একাই মনে মনে কথা বলেন। পুরনো দিনের কথাগুলি এখনও তার বেশ লাগে। যেমন, “দূরে দূরে গ্রাম দশ বারো খানি মাঝে একখানি হাট। সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ প্রভাতে পড়ে না ঝাঁট।” এরকম আরও যে কত কথা আছে। কালবৈশাখীটাও তার মুখস্থ। তার পর ধরা যাক, “ছিপ খান/তিন দাঁড়/তিনজন মাল্লা।” কথার ছন্দে পা ফেলতে ফেলতে এগিয়ে যান তিনি।
এরকম ভাবছেন যখন, তখনই কুচাই সামনে এসে বলল, গুড মর্নিং জেঠু। কুচাইয়ের দেখাদেখি গুটকে, বটা আর ভোম্বলও এসে হাজির।
ওরা প্রতিদিনই দলবেঁধে এসে ঘিরে ধরে গগনবাবুকে। ওদের লেজ নাড়ার ভঙ্গি দেখে আর পা ছোড়া দেখে বেশ বোঝা যায় ওরা মানুষটার খুব অনুরাগী। প্রথমে ওদের সঙ্গে একচোট কথাবার্তা সেরে নেন তিনি। বলেন, “কী রে, সব ভাল আছিস তো?”
কী করে ভাল থাকব জেঠু? যা গরম পড়েছে।

গগনবাবু হাসেন। “গরম পড়েছে তো কী, পাশেই এতবড় একটা দিঘি, গা ডুবিয়ে  বসে থাকবি।”
“বসে থাকলে আমাদের চলবে? কথা বলে গুটকে। এখন আমাদের কথাবার্তা ভাল লাগছে না জেঠু। নাও, তাড়াতাড়ি আমাদের বিস্কুট দাও।
হ্যাঁ, ওই চারজনের জন্য বিস্কুট আনেন গগনবাবু। সকালবেলা দশ টাকার বিস্কুট এদের প্রাপ্য। লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করে বিস্কুট খায় যখন, তখন দেখতে যে কী ভাল লাগে। নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি, মারামারিও কখনও কখনও করে। পাশে দাঁড়িয়ে গগনবাবু শাসন করেন। “অ্যাই ভোম্বল, এবার মার খাবি।” বটাটা আবার একটু নরমসরম, খানিক দুর্বলও। ওকে একটু পাশে নিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন গগনবাবু। ভোম্বল আড়চোখে তাকিয়ে দেখে বলে, এটা কিন্তু ভাল হচ্ছে না জেঠু। ওকে আদর দিয়ে তুমি মাথায় তুলছ।
আসলে মাথায় তোলা নয়, বটা দুর্বল বলেই বোধহয় একটু বেশি ভালবাসেন তিনি।  ওর জন্য একটা বেশি বিস্কুট তিনি বরাদ্দ করে রাখেন।
খাওয়া হয়ে যাবার পরেও ওই চারজন ঘিরে রাখে গগনবাবুকে। তিনি বলেন, “এবার ছাড়, আমি হাঁটব।” ওরা বেশ বুঝতে পারে। তখন পথ ছেড়ে দেয়।  ওদের জলখাবার পর্ব সারা। কত আর বয়স, হয়তো দু’মাস । ভারি সুন্দর দেখতে হয়েছে ক’টাকে। দেখলে আর চোখ ফেরানো যায় না।
প্রথম দিন দেখার পর দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। তখন ওদের বয়স হয়তো মাত্র সাত দিন। টলতে টলতে হাঁটছে। এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে। এমনি এমনি কামড়া-কামড়ি করছে। দেখতে দেখতে এত ভাল লেগে গেল! গগনবাবু হাঁটু মুড়ে বসে একটার গায়ে একটু হাত রাখতে যাবেন, ঝা ঝা করে তেড়ে এল একজন। এসেই বলল,  খবরদার গায়ে হাত দিয়ো না বলে দিচ্ছি।
গগনবাবু হেসেছিলেন। এটা নিশ্চয়ই ওই চারজন খোকা-খুকুর মা। বলেছিলেন, “আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে? তোর ছেলে চুরি করতে এসেছি?”
কথাটায় কী ছিল কে জানে। মায়ের সঙ্গে ভাবসাব হয়ে গেল গগনবাবুর। প্রথম প্রথম মা কাছছাড়া করত না। মাসখানেক পর থেকে মাকে ছাড়াই বড় হতে লাগল বাচ্চাগুলো। ভারি আনন্দ করে থাকে ওরা।
সকালবেলা গগনবাবুর কাছে জলখাবারটি খায়। একটু বেলা হলে সদানন্দ দাদু রুটি-তরকারি দেন। রেবা দিদিমণি একসময় স্কুলে পড়াতেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ওপর তার খুব মায়া। বটা, ভোম্বল এরাও তো ছোট-ই। এদের প্রতি মায়া থাকবে না তা তো হয় না। লাঞ্চে রেবা দিদিমণি এদের জন্যে ভাত তরকারি, মাছের টুকরো, মাংসের হাড় বরাদ্দ করে রেখেছেন।
পাঁচ পাক শেষ হয়ে গেল। আর এক পাক হলেই আজকের মর্নিং ওয়াক শেষ হবে। তখনই চারজন খোকা-খুকু  চিল চিৎকার  করে উঠল। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে একটা কালো-কুলো লোককে ওরা ঘিরে ধরেছে। পুকুরের এপার থেকে গগনবাবু বললেন, “অ্যাই ভোম্বল, বটা-আ-আ—”
আজ তার কথায় কোনও পাত্তাই দিল না ওরা । লোক নয়, হয়তো ছেলেই বলা যায়। তাকে ঘিরে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে। ছেলেটা ভয়ে নীল হয়ে গেছে। এই বুঝি কামড় বসাল।
একটু পা চালিয়ে এপারে চলে এলেন গগনবাবু। যেমন ভেবেছিলেন তেমন দেখলেন না। তিরিশের এদিক-ওদিক বয়স হবে। বেশ ভদ্র-সভ্য চেহারা,  এদিকে হয়তো নতুন এসেছে। অচেনা বলেই ওরা প্রতিবাদ করছে।
গগনবাবু বললেন, “যাহ্‌ যাহ্‌।”
এ কথায় ওরা গেল না। আরও যেন তেড়ে গেল ছেলেটার দিকে। সে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে তাকিয়ে আছে।
তিনি আবারও বললেন, “অ্যাই, ছেড়ে দে।”
কিন্তু এসব বলাই  সার। গগনবাবু তখন রাগ করে এগিয়ে গেলেন। সামনে ছিল কুচাই। ওই হল পালের গোদা। সোজা গিয়ে ওর কানটাই ধরলেন। “লোক চিনতে পারিস না বাঁদর। ইনি কী করেছেন তোদের?”
কানমলা খেয়ে সরে যেতে এবার  তাকালেন গগনবাবু। “তুমি কে হে?”
“আজ্ঞে, আমি একটা লোক।”
উত্তর শুনে একটু হাসি এল। কিন্তু তিনি হাসলেন না। বুঝলেন ছেলেটা বেশ মজার।  না হলে তুমি কে এই প্রশ্ন শুনে কেউ বলতে পারে যে আমি একটা লোক! এমন মানুষের সঙ্গে খানিকটা সময় কাটানো যেতেই পারে। গগনবাবু হাসলেন। তার পর বললেন, “খুব তাড়াহুড়ো না থাকলে চলো, হাঁটতে হাঁটতে তোমার সঙ্গে খানিক কথা বলি।”
এ কথায় ছেলেটা শুধু রাজি হল না, পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করল।
গগনবাবু বললেন, “থাক কোথায়? কাজ কর কী?”
“আজ্ঞে, কাজ কিছু করি না। থাকি পথে আর ঘাটে। গতকাল রাতে ছিলাম নতুন তিলিঘাটে। ঘাটের চওড়া চওড়া সিঁড়িতে শুয়ে রাত কেটে গেল। আহা গঙ্গার কী হাওয়া।”

যত শুনছেন ততই অবাক হচ্ছেন গগনবাবু।  অবাক গলাতেই বললেন, “খাও কী?”
“যখন যেমন জোটে তখন তেমন খাই। না জুটলে খাই না।”
“সে কী!”
“আপনি বড় চিন্তা করছেন মনে হচ্ছে। আজকাল খাওয়া নিয়ে আর তেমন চিন্তার কিছু নেই স্যার। বলতে নেই, সব বাড়িতেই খাবার বাড়তি হয়ে যাচ্ছে। খুঁজে দেখুন, বাড়িতে আর খাবার লোক পাবেন না।”
গগনবাবু অবাক হয়ে বললেন, “তাই!”
“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। এই তো গতকাল পালপাড়ায় অভিনব মুখার্জির বার্থডে সেলিব্রেশন ছিল। অভিনবকে চেনেন?”
গগনবাবু বললেন, “না, ঠিক চিনতে পারছি না।”
ছোকরা হাসল। বলল, “ইনকাম ট্যাক্সের অফিসার অনাদি মুখার্জি, তার ছেলে। নিমন্ত্রিত একশো জনের মতো। আয়োজন হয়েছিল  একশো পঁচিশ জনের । এসেছিল নব্বুই জন। তার মানে পঁয়ত্রিশ প্লেট এক্সট্রা।”
গগনবাবু বললেন, “রোজ বাড়ি বাড়ি এমন সেলিব্রেশন কিন্তু হবে না।”
“তা অবশ্য হবে না। তবে রোজই আজকাল কোথাও না কোথাও  কিছু হয়ই।”
“সেটা আবার কীরকম?”
“গেল পরশু সুবীর ভট্টাচার্যের প্রমোশনের খাওয়া ছিল।”
“তাই না কি?”
“ঢালাও মাটন বিরিয়ানির ব্যবস্থা ছিল স্যার। তবে আসল ব্যবস্থা ওটা নয়।”
“আসলটা কী?”
“আসল হল জল, মানে হার্ড ড্রিঙ্কস।” ছেলেটা হাসল একচোট। তার পর বলল, “আসলের ঠেলায় তিরিশ প্যাকেট নকল ফেলে দেওয়ার অবস্থায় চলে গেছিল।”
“তার পর?”
“তার পর আর কী, আমার কাছে খবর পৌঁছল। আমিএক প্যাকেট খেলুম। সকালে জলখাবারের জন্য এক প্যাকেট নিয়েও এসেছি। বাকিটা ফ্রিজে রেখে দিতে বললুম। সময় করে ব্যবস্থা হবে।”
“ইস, এতগুলো টাকা নষ্ট! তার ওপর এইসব খাবার!”
ছোকরা হাসল। “আপনি অনেক কিছুই জানেন না দেখছি। আজকাল লোকে ডাল-ভাতের বদলে এইসব খাচ্ছে বেশি। দিনকাল খুব বদলে গেছে জানেন। চারদিকে খুব রেস্টুরেন্ট খোলার চল হয়েছে। এই তো এখানে নতুন একটা হল, ‘আবার খাব’ নামে রেস্টুরেন্ট, স্টেশন রোডের রেস্টুরেন্টের নামটা  বেশ লাগসই, ‘জিভে জল’, আর একটার নাম ‘খাই খাই’। নতুন নতুন হয়েই যাচ্ছে, হয়েই যাচ্ছে। বিক্রিবাট্টাও খুব। সব বাড়িতেই এখন রাতের খাবার আসছে রেস্টুরেন্ট থেকে। তিন প্যাকেট বিরিয়ানি, তার দুটোই  শেষ হচ্ছে না। তখনই আমার ডাক পড়ে।”
গগনবাবু বললেন, “ব্যাপারটা বুঝলাম না হে।”
ছোকরা আবার হাসল। “ও আপনি বুঝবেন না স্যার। আপনি পুরনো দিনের লোক। পৃথিবীটা বদলে গেছে। ঘরে বসে টের পাবেন কী করে?”
কথাটা যে ভুল তা নয়। রিটায়ারমেন্টের পর তিনি ইচ্ছে করে সরিয়ে নিলেন নিজেকে। ছেলে-মেয়েরা অনেক দিনই দেশছাড়া। স্ত্রী  আগেই গত হয়েছেন। এখন তিনি একা। তাই কোলাহল থেকে, পরিজন থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। গগনবাবু এখন তিয়াত্তর  ছুঁই ছুঁই। তার বাড়ি শহরের একটেরে। আসলে সেটা শহরও নয়। নিজের পুরনো দিনের বাড়িটি বেচে দিয়ে, খোলা মাঠের ধারে, এই নির্জন জায়গায় ছোট্ট বাড়িটা করেছেন গগনবাবু। সমবয়সিরা আশেপাশে আর কেউ নেই। তাই একা হয়ে গেছেন। অবশ্য একাও ঠিক বলা যায় না। সকালে ওই বড় দিঘির ধারে চারজন খোকা-খুকু তাকে সঙ্গ দেয়।
বাড়িতে ফিরে আসতে না আসতেই দেখেন, ননীগোপাল তার জন্য অপেক্ষা করছে। ননীগোপাল হল সেই পায়ে চোট লাগা শালিখটা। তার জন্য আধখানা রুটির বন্দোবস্ত করা  আছে। দশটায় বিশ্বনাথ আসে দুধ নিয়ে। “কী? কেমন? সব ভাল তো বিশ্বনাথ?” এই বলে কথা শুরু করতে চান গগনবাবু। কিন্তু বিশ্বনাথের কোন টাইমই নেই। “পরে পরে” বলতে বলতে সাইকেলে উঠেই প্যাডেল চালিয়ে দেয়।
মিনুদিদি অবশ্য আগেই আসে। তবে একসঙ্গে হাত-পা আর মুখ  চালায় মিনু।  মেয়েটার বড্ড মুখ। ওই মুখের সামনে দাঁড়ায় কার সাধ্যি। পান থেকে চুন খসলেই তড়বড়িয়ে ওঠে। বলে, “আমি আর পারব না, এই চললাম।” বলে কিন্তু যায় না। ওর দোষ নেই, কাজ কী কম!
তার এক কামরার ঘর। ঘরে চেয়ার-টেবিলের বন্দোবস্ত নেই। পা ঝুলিয়ে রোয়াকে বসেন সাধারণত। আজও তাই বসলেন। আজ সঙ্গে নতুন একটা লোককে দেখে মিনু গজগজ করে উঠল, “ও আবার কে শুনি?”
গগনবাবু বললেন, “চুপ চুপ, শুনতে পাবে।”
কথায় কান না দিয়ে মিনু বলল, “শুনুক। ওটা কুঁড়ের বেহদ্দ।”

“তুমি চেন না কি?”
“চিনব না! কাজের বাড়ির বাড়তি খাবার খেয়ে বেড়ায়, ভিকিরি টাইপের। ওকে আপনি কোথা থেকে জোটালেন শুনি?”
কথাটা শুনে খারাপ লাগল গগনবাবুর। ওই ‘ভিকিরি’ কথাটা। কথাটির মধ্যে লজ্জা আছে, অপমান আছে। ছোকরাকে দেখে কিন্তু বোঝার উপায় নেই। নিপাট ভদ্রলোক যেন।
লজ্জায় মরে যাচ্ছিলেন গগনবাবু। ছোকরা তার পাশেই বসে আছে। নির্ঘাত শুনতে পেয়েছে কথাটা। কথাটা চাপা দিতেই কথা শুরু করলেন তিনি। বললেন, “এতক্ষণ তো বকবক করছি। এদিকে তোমার নামটাই জানা হয়নি।”
“আপনার কথা ঘোরাবার দরকার নেই স্যার।” ছোকরা হাসল, “ওসব আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। আমার নাম নির্মল। তবে আপনার জেনে রাখা ভাল, নির্মল ছেলেটা  কিন্তু ভিখিরি নয়।  দস্তুরমতো গ্র্যাজুয়েট। দশ বছর ধরে চাকরির চেষ্টা করছি। দু-একটা যে পাইনি তা নয়। কিন্তু সবগুলোই প্রায় মিস ফিট। বিনা আমন্ত্রণে আমি কিন্তু খেতে যাই না। দস্তুরমতো বাড়ি থেকে আমাকে ডাকে।”
“তাই না কি?”
“হ্যাঁ তাই। এই যেমন গতকাল মুখার্জিদার বাড়ি থেকে ডাকল আমাকে। তখন রাত আটটা হবে। বলল দশটা নাগাদ এলেই হবে। চিকেন চাপ আর রুটি। দুটো আইটেমই বেশি বেশি এসে গেছে। ওদিকে খাবার লোক নেই। তাই আমার ডাক পড়েছে।”
“এই ডাক পড়াটা কি খুব সম্মানের?”
“সম্মান  নয়! একশোবার সম্মান। আমি যাই ওই মানুষগুলোকে কৃতার্থ করতে। খাবারগুলো যত দামিই হোক, বাসি হলেই সেগুলো পচে পরিবেশ দূষণ ঘটাবে। তার আগেই যদি ওগুলোর একটা সুবন্দোবস্ত হয়ে যায়, সেটা কি কাঙ্ক্ষিত নয়?”
গগনবাবু হাসলেন। বললেন, “এটা হল সেলফ ডিফেন্স। জোর করে নিজেকে সম্মানিত করার চেষ্টা।”
গগনবাবু আরও কিছু  বলার আগেই নির্মল বলল, “আপনার চা কখন আসবে?”
মিনু বলে ডাকতে যাচ্ছিলেন গগনবাবু। তার আগেই দেখলেন একটা ডিশে দুটো কাপ নিয়ে মেয়েটা এসে হাজির। ডিশটা মেঝেতে নামাচ্ছে। দেখলেন গোটাকয়েক বিস্কুটও সাজানো।
ছেলেটা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “আপনার বাজার-টাজার করার থাকলে আমাকে বলতে পারেন।”
গগনবাবু অল্প হেসে বললেন, “এতে কিছু কমিশন-টমিশন থাকে নিশ্চয়ই?”
ওসব কমিশনের কথা আমি ভাবি না। এই যে আপনার বাজার করে দিচ্ছি, এতে আমার দুপুরের লাঞ্চটা কনফার্ম হয়ে গেল। ঠিক কি না?”
“হ্যাঁ ঠিক। একেবারে ঠিক। আজ দুপুরে তুমি আমার সঙ্গে খাবে। ঠিক আছে?”
নির্মল একটু অবাক হয়ে তাকাল। গগনবাবু হাসলেন। “উদ্বৃত্ত হয়ে যাওয়া খাবার নয় কিন্তু, তোমার ভাগের খাবারটাই তোমাকে দেওয়া হবে। মুরগ মোসল্লম হয়তো হবে না । ডাল, ভাত, একটা ভাজা, আর কচি মাছের ঝোল।”

***

সপ্তাহে দু’দিন বাজার যান গগনবাবু। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আজ টোটোয় উঠতে যাবেন, নির্মল বলল, “এইটুকু যাবার জন্য গাড়ি কী দরকার। চলুন, কথা বলতে বলতে চলে যাই।”
“শুধু একদিন কনফার্ম হলে তো হবে না। মাসে তিরিশটা  দিন, সব দিনগুলিই যদি কনফার্ম করতে চাও…।”

এ কথায় ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল। “আপনার কী ধান্দা বলুন তো?”
গগনবাবু হাসলেন। “আমার জন্যে নয়, তোমার কথা ভেবেই বলছি। শুধু লাঞ্চ নয়, দু’বেলার ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। যদি তুমি রাজি থাক।”
ছেলেটা হাসল। বলল, “পোষাবে না, বুঝলেন। দু’বেলা ভেজ মিল অসম্ভব! তবুও ব্যাপারটা হয়তো মানিয়ে নেওয়া যেতে পারত কিন্তু একজন বুড়োর সঙ্গে দিন-রাত কাটানো ইমপসিবল।”
এবার আর হাসি চাপতে পারলেন না গগনবাবু। হো হো করে হেসে উঠলেন। “তুমি মানুষটা বেশ। দু’দণ্ড কথা বলে শান্তি।”
এখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দু’জনে। সারদা ভিলায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন গগনবাবু। পুরনো আমলের বাড়ি। বাড়ি নয়, বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। বেশ বড় কম্পাউন্ড, চারদিকে প্রাচীন কিছু গাছ।
নির্মল বলল, “কোথায় যাচ্ছেন?”
“এসো না।” নির্মলের হাতটা অল্প করে ছুঁয়ে দিলেন গগনবাবু। সামনের বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে প্রায় ঝিমোচ্ছিলেন একজন।  চোখদুটি বোজা। গগনবাবু পাশে দাঁড়িয়ে আলতো করে ডাকলেন, অনাদিদা।”
অনাদিদা মানুষটি সোজা হয়ে বসলেন। মেরুদণ্ড টানটান, স্বচ্ছ চোখের দৃষ্টি। শুধু মুখখানিতে বিষণ্ণ হাসি লেগে আছে। বললেন, “বোসো গগন। তুমিও বোসো।” নির্মলের দিকেই তাকিয়ে বললেন, “চিনতে পারলাম না।”
“ওর নাম নির্মল। গ্র্যাজুয়েট, বয়স তিরিশ, আপাতত বেকার। একমাত্র কোয়ালিফিকেশন হল বকবক করতে পারা। তাই  দু’ঘণ্টার জন্য আমি ওকে এনগেজড করলুম।”
“তার মানে?”
“তার মানে এটা ওর চাকরি। সকাল সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকবে। আমি ওকে মাসে তিন হাজার দেব।”
“এই কাজই কর বুঝি?” অনাদিদা নির্মলের দিকে তাকালেন।
“এতদিন করতাম না। আজ থেকে শুরু হল স্যার।”
“না, ওইসব স্যার-ফ্যার চলবে না। তুমি আমাকে জেঠু বলতে পারো। দশটা থেকে বারোটার স্লট কি ফাঁকা আছে তোমার?”
নির্মল কিছু বলার আগেই গগনবাবু বললেন, “হ্যাঁ দাদা ওই স্লটটা আপাতত ফাঁকা।”
“বেশ, তাহলে কাল থেকে শুরু করে দাও। আমিও তিন দেব।”
এক কাপ করে চা খেয়ে বেরিয়ে এলেন গগনবাবু। পাশে নির্মল এতক্ষণ একটিও কথা বলেনি। বাজার করার সময়ও  সে নীরব হয়ে রইল। আজ একটু চিকেন নিলেন গগনবাবু। ছেলেটা দুপুরে লাঞ্চ করবে। তিনি অবশ্য চিকেন খান না। তার জন্য কচি মাছের পাতলা ঝোল।
হাতের ব্যাগটা বারান্দায় নামিয়ে রাখতে রাখতে নির্মল বলল, “এটা কী হল জেঠু?”
গগনবাবু বললেন, “একটা কাজ হল, বুঝলে। তুমি বেশ কথা বলতে পার, এটাই তোমার ক্যাপিটাল। আর একটা কথা, আজকের দিনটা বদলে যাচ্ছে দ্রুত, এটা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না, কথাটা ঠিকই।  তুমি আজকের দিনটার কথাই শুধু বললে। তবে ভবিষ্যত যে আরও দ্রুত বদলে যাবে, আগাম সেটা টের পাচ্ছি নির্মল। তখন ঘরে ঘরে কথা বলার লোক দরকার হবে।”
নির্মল হাসল। বলল, “বুঝলাম। আপনার স্লট সাতটা  থেকে  ন’টা। কিন্তু  ঘড়িতে এখন এগারোটা বাজছে। মনে রাখবেন, আমার কিন্তু দু’ঘণ্টা ওভারটাইম পাওনা হয়ে গেল।”
এবার হো হো করে হেসে উঠলেন গগনবাবু। বললেন, “গুড। মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি তোমার সব স্লটই বুক হয়ে যাবে।

অলংকরণ : দেবাশীস সাহা

 

মতামত জানান

Your email address will not be published.