বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

রবীন্দ্রগান আর চলচ্চিত্র : সত্যজিতের সংগত

রুশতী সেন

 

সদ্য শেষ হয়েছে সত্যজিৎ রায় জন্মশতবর্ষ। পাঠকের হাতে এসেছে সন্দীপ রায় সম্পাদিত সত্যজিতের ‘রবীন্দ্রনাথ’ (বিচিত্রা, মে ২০২২) বইটি। অন্য অনেক মূল্যবান লেখার সঙ্গে এ বইতে আছে ‘রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে’ সুভাষ চৌধুরীর নেওয়া সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার । এ সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘আজকাল’ পত্রিকায়, ১৯৮১-র ২৯ মার্চ। সম্পূর্ণ ভাষ্যটির প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯ সালে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘ধ্রুবপদ’ বার্ষিক সংকলনে। ‘আজকাল’-এর সংস্করণটির শিরোনাম ছিল ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’ আর ‘ধ্রুবপদ’-এ ‘সাক্ষাৎকার/প্রসঙ্গ রবীন্দ্রসংগীত’। সাক্ষাৎকারটি প্রথম গ্রন্থিত হয় ১৪১০ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ ‘ইন্দিরা’-র উদ্যোগে। বইয়ের নাম ‘বিষয় : রবীন্দ্রসংগীত’, লেখক সত্যজিৎ রায়।  সাক্ষাৎকারে ফিরে ফিরে এসেছে ১৯৬৭-তে লেখা সত্যজিতের ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’ (সত্যজিৎ রায় ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৫, পৃ. ৩৬৮-৮৭) প্রবন্ধটির প্রসঙ্গ। সত্যজিৎ তাঁর লেখায় কথার সঙ্গে সুরের অর্ধনারীশ্বর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আস্থার কথা বলেছেন, বলেছেন, কথা যদি সংগীতের রাজ্য ছেড়ে ভাবের রাজ্যে উপস্থিত হয়, তো সেটা হবে একাধারে কাব্যের অপমান আর সংগীতের অপব্যবহার। সত্যজিতের এই মতের স্পষ্টতর ব্যাখ্যার আশায় সুভাষ চৌধুরী বলেন, গানের ক্ষেত্রে সুরটাকেই আপনি বেশি… জোর দিতে চান, সত্যজিৎ উত্তর দেন— সুরটা বেরচ্ছে কথার থেকে। অনেক সময় এমনও দেখা যায়… দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ভাবের গান, কথার দিক থেকে বিচার করলে, কিন্তু… একই রাগের ছাঁচে ঢেলে ফেলা হয়েছে তাদের। (সত্যজিৎ রায় ‘রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, পৃ. ১২৯)।
প্রশ্নের দিশা একটু বদলে সুভাষ চৌধুরী যখন সত্যজিতের নিজের গান compose করার প্রসঙ্গ তুলেছেন, সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীত প্রয়োগের কথা কখনই আনেননি। যে প্রসঙ্গে তাঁরা দু’জনে বারবার সহমত, তা হল, স্বরলিপিতে কী কী পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রগানের অর্থবোধ প্রসঙ্গে স্বরলিপি নীরব; আর সংগতের নির্দেশও সেখানে অমিল। তাই যিনি গাইছেন তাঁর কণ্ঠের বিরামের সময়ে কোন যন্ত্রানুষঙ্গ যথাযথ,তার উল্লেখও অমিল।

১৯৬৭-র প্রবন্ধটি এবং চোদ্দো বছর পরে প্রথম প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি পড়তে পড়তে মনে হল, ব্যক্তের চারপাশে কোনও অব্যক্তকে যেন পড়া যায়। সত্যজিৎ যখন তাঁর চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করেছেন তখন সে সংগীতে কি সংগত করেছে সংলাপ, সংলাপহীনতা, আলো, অন্ধকার? রবীন্দ্রগানের নামমাত্র প্রক্ষেপ রেশ রেখে গেছে গোটা চলচ্চিত্র জুড়ে, এমনও কি ঘটেনি কখনও? শুধু সত্যজিতের নির্মাণে নয়, বহু চলচ্চিত্র নির্দেশক রবীন্দ্রসংগীতের অনুষঙ্গে তাঁদের সৃজনের অর্থে যোগ করেছেন বাড়তি মাত্রা। আপাতত সত্যজিতের কয়েকটি চলচ্চিত্রকে গানের ভিতর দিয়ে দেখলে, রবীন্দ্রসংগীতের কথা-সুরে, আবার সত্যজিতের চলচ্চিত্রেও, কোনও বাড়তি দ্যোতনার আভাস মেলে কি?
ফিরে যাই ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’ প্রবন্ধটির প্রথম প্রকাশেরও দু’বছর আগে, ১৯৬৫-তে। না, ‘মহাপুরুষ’-এ রবি ঘোষ অভিনীত বিরিঞ্চিবাবার শিষ্যের কণ্ঠে সেই বিখ্যাত ‘প্রলয়নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে’ আমাদের আলোচনার বিষয় নয় । আমরা দেখব ‘কাপুরুষ’। এ চলচ্চিত্রে,  শুধু এখানে নয়, সত্যজিতের কোনও সৃজনেই রবীন্দ্রগানের ব্যবহার নিয়ে কোনও কথা পূর্বোল্লিখিত প্রবন্ধে বা সাক্ষাৎকারে ওঠেনি। সত্যজিতের যেসব কাহিনিচিত্রের ভিত রবীন্দ্রকাহিনিতে, সেই ‘তিন কন্যা’, ‘চারুলতা’, ‘ঘরে-বাইরে’–র প্রসঙ্গ এ আলোচনায় থাকবে না। বাদ দেব ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রকেও, যেখানে ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরুগুরু’ গানটির অসামান্য দৃশ্যায়ন ছিল। দেখা যাক, গানের ভিতর দিয়ে কিছু কথা তৈরি করা যায় কিনা ।
কাপুরুষের নাম অমিতাভ রায়। প্রেমিকা করুণা যখন সম্পর্কের দাবি নিয়ে অমিতাভর কাছে এসেছিল, পিছিয়ে গিয়েছিল অমিতাভ। চলচ্চিত্র যেখানে শুরু সেখানে অমিতাভ ফিল্মের গল্প লেখে, চিত্রনাট্যকার; তার আগামী চিত্রনাট্যের প্রেক্ষাপট  খানিকটা পাহাড়ি শীতপ্রধান এলাকায়। স্থানীয় বর্ণ-গন্ধের সন্ধানে সে যাচ্ছে হাসিমারা। পথে ঝড়জলের রাতে গাড়ি বিগড়ে এক রাতের আশ্রয় মিলেছে tea planter বিমল গুপ্তর বাংলোয়। বাংলোর মালিক যখন অতিথিকে নিয়ে বাংলোয় ফিরছেন, বিমল গুপ্তর স্ত্রী তখন রেডিওতে শুনছিলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’। বিমল যখন অমিতাভকে নিয়ে জিপ থেকে নামছেন, বাংলোর ভিতর থেকে ভেসে আসছে, ‘হাহাহাহা হাহাহাহা বালকের দল/মা’র কোলে যাও চলে— নাই ভয়।/অহো, কী অদ্ভুত কৌতুক’। বিমল গুপ্ত অতিথিকে নিয়ে বাংলোয় ঢোকেন। মিসেস গুপ্ত বলেন, “দ্যাখো না কী খারাপ reception হচ্ছে!” সেটাই স্বাভাবিক এরকম ঝড়জলের দিনে। বিমল বলেন, “আমি কিন্তু একা নই।” সুচিত্রা মিত্রের সুপরিচিত কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে চিত্রাঙ্গদার গান, ‘অর্জুন! তুমি অর্জুন!ফিরে এসো, ফিরে এসো—/ক্ষমা দিয়ে কোরো না অসম্মান,/যুদ্ধে করো আহ্বান!/বীর-হাতে মৃত্যুর গৌরব/করি যেন অনুভব—/অর্জুন! তুমি অর্জুন’।। চিত্রাঙ্গদার এই আর্তির আবহে অমিতাভ দেখে, বিমল গুপ্তর স্ত্রী আর কেউ নয়, করুণা। করুণাও দেখে অমিতাভকে। সে যখন রেডিও বন্ধ করে, চিত্রাঙ্গদা তখন বলছে, ‘হা হতভাগিনী…’। গানের পরবর্তী অংশ, ‘… এ কি অভ্যর্থনা মহতের,/এল দেবতা তোর জগতের,/গেল চলি,/গেল তোরে গেল ছলি’, শোনা যায় না। রেডিও বন্ধ করে করুণা বলে, “কী বিশ্রী দিন!”

কাপুরুষ

ভুল নেই করুণার কথায়। দিনটা খারাপ বলেই না ঝড়জলের রাতে গাড়ির কয়েল বিগড়ে অমিতাভ বিপন্ন! দিনের গতিক ঠিক নেই বলেই না করুণার রেডিওতে reception ঠিক হচ্ছে না! আরও কোনও ব্যঞ্জনা কি আছে করুণার ওই উচ্চারণে? অমিতাভকে অভ্যর্থনা জানাতে হচ্ছে, এই কারণেও কি দিনটা করুণার কাছে বিশ্রী? সে অভ্যর্থনায়, আতিথেয়তায় কোনও ত্রুটি নেই করুণার। গেস্টরুমের সংলগ্ন ওয়াশরুমে কাচা তোয়ালে রেখে যায় সে, কাবার্ড চাবি দিয়ে খুলে ব্যবহারযোগ্য করে দেয়। করুণার সঙ্গে এভাবে দেখা হয়ে যাওয়া নিয়ে অমিতাভ যখন বিস্ময় প্রকাশ করতে চায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের বাইরে থেকে পরিচারক জানতে চায়, অতিথির জন্য ‘নাহানে কা গরম পানি’ লাগবে কিনা। অমিতাভকে করুণা জিজ্ঞাসা করে, “আপনার গরম জল লাগবে নিশ্চয়?” অমিতাভ উত্তর দিতে পারে না, করুণাই বলে দেয় পরিচারককে, “হাঁ, দে দেনা”, তার পর গেস্টরুম থেকে বেরোতে বেরোতে বলে, “বিছানাটা খাবার সময় করে দেবে।” এইসবই অভ্যর্থনা, তবে তা মহতের নাকি কাপুরুষের, সে প্রশ্ন নিরর্থক নয়। আবার মহৎ আর কাপুরুষ আদতে অভিন্ন কিনা, সে প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক। সেই অর্জুনের যুগ থেকে অমিতাভর জমানা পর্যন্ত হয়তো সেই প্রাসঙ্গিকতা বিছিয়ে থাকে। এত স্বাভাবিক আতিথেয়তা করুণার যে অমিতাভ হতবাক। গেস্টরুমের দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে করুণা, দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এসেছে দর্শকের কানে। পরমুহূর্তেই অমিতাভর বিস্মিত বিষণ্ণ মুখের আবহে বেজে ওঠে চিত্রাঙ্গদার গান, ‘দে তোরা আমায় নূতন করে দে নূতন আভরণে।/হেমন্তের অভিসম্পাতে রিক্ত অকিঞ্চন কাননভূমি—/বসন্তে হোক দৈন্যবিমোচন…’।

অর্থাৎ অতিথির প্রাথমিক দেখভাল সেরে করুণা আবার রেডিও চালিয়েছে। যেটুকু সময় রেডিও বন্ধ ছিল, সেই অবসরে পেরিয়ে গেছে এল পি রেকর্ডে ‘চিত্রাঙ্গদা’–র দুটি বিখ্যাত গান, ‘বঁধু, কোন্‌ আলো লাগল চোখে’ আর ‘ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে শুনি/অতল জলের আহ্বান’। ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’-য় রবীন্দ্রসংগীতের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে যে বারোটি গানের উল্লেখ করেছিলেন সত্যজিৎ, ‘ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে শুনি’ তার একটি। (সত্যজিৎ রায় ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’, পৃ. ৩৭৯)। কোনও আহ্বানকে ধারণ করবার পক্ষে করুণার মন কি আজ বড় বেশি শীতল? এই যে পরম স্বাভাবিক অভ্যর্থনা-আতিথেয়তা, এই যে ‘আপনি’ সম্বোধন অমিতাভকে, এসবই তো অমিতাভর চোখে করুণার ‘নূতন আভরণ’! সে আভরণ কি নিছক আবরণ, না কি নিরাবরণ সত্য, সে প্রশ্ন ‘কাপুরুষ’ চলচ্চিত্রে শেষপর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যায়। সেখানেই এ নির্মাণের বৈশিষ্ট্য। একান্ত পরিচিত ‘চিত্রাঙ্গদা’  গীতিনাট্যের কতটুকু চলচ্চিত্রের দর্শকের শ্রুতির নাগালে এল, আর কতটুকু থেকে গেল নাগালের বাইরে,  ব্যক্ত-অব্যক্তের সেই সম্মিলনে একাধিক বিকল্প অর্থের ইঙ্গিত বিছিয়ে যায় করুণা-অমিতাভর অসার্থক দেওয়া-নেওয়ার পরতে পরতে। ‘চিত্রাঙ্গদা’-র ব্যক্ত-অব্যক্তের সংগতে মূল কাহিনিচিত্রের সংলাপ আর নৈঃশব্দ্য শূন্যের ভিতরকার ঢেউ গোনে, না কি ঢেউ-এর অন্তর্লীন শূন্যতাকে চেনায়, সে মীমাংসার দায় শেষপর্যন্ত দর্শকের।
পরদিন রবিবার। অতিথিকে নিয়ে পিকনিক স্পটে যাওয়ার পথে জিপ চালাতে চালাতে বিমল গুপ্ত গাইছেন Isle of Capri। ১৯৩৪-এ Jimmy Kennedy লিখেছিলেন এই গান, সুর করেন Hugh Williams, ১৯৫৮-তে গানটি বেজায় জনপ্রিয় হয় Frank Sinatra-র গলায় । ১৯৬৫-র চলচ্চিত্র ‘কাপুরুষ’, বিমল গুপ্ত গাইছেন প্রথম চারটি পঙ্‌ক্তি : ‘twas on the Isle of Capri that I found her/Beneath the shade of an old walnut tree/Oh, I can still see the flowers blooming round her/Where we met on the Isle of Capri’। বিমল গুপ্তর গলায় সুরের থেকে উল্লাসটাই বেশি। শুনতে শুনতে আর করুণার মাথায় বাঁধা সিল্কের স্কার্ফের সঞ্চালন দেখতে দেখতে অমিতাভ ফিরে যায় অনেকদিন আগেকার এক বাসযাত্রার স্মৃতিতে। স্কার্ফবাঁধা মাথাটি থেকে দর্শকও চলে যান বাসের সিটে পিছনে হেলানো বেণীবাঁধা মাথায়। করুণা সেদিন মনের ভুলে ব্যাগে ভাড়ার পয়সা আনেনি; তার টিকিট কেটে দিয়ে অমিতাভ তাকে বাঁচিয়েছিল অপ্রস্তুত লজ্জার হাত থেকে। ওই ঘটনাই তাদের নৈকট্যের উপক্রমণিকা। স্মৃতি থেকে যখন বর্তমানে ফেরে অমিতাভ, Isle of Capri থেমে গেছে, করুণা আপনমনে গাইছে, ‘এ পথে আমি যে গেছি বার বার, ভুলি নি তো এক দিনও।/আজ কি ঘুচিল চিহ্ন তাহার, উঠিল বনের তৃণ’। গানের এইটুকুই শোনা যায় করুণার গলায়, ‘চিনিব তোমায় আসিবে সময়…’ পর্যন্ত গান গড়ায় না। গড়ানোর কথাও নয়, অমিতাভ রায় আর বিমল গুপ্ত, দু’জনকেই বোধহয় হাড়ে হাড়ে চেনা হয়ে গেছে করুণার। তবু ও গানে বেহাগের প্রক্ষেপে, দুটি মধ্যমের ব্যবহারে কেমন এক আবেশ তৈরি হয়। আসলে কি পিকনিক স্পটে পৌঁছনোর এই মনোরম পথটিকে নিয়ে গাইছে না করুণা? যদিও উদার প্রকৃতিতে ভরপুর এই পথ ধরে সুদৃশ্য পিকনিক স্পটটিতে সে আগেও অনেকবার গেছে! আসলে সেও ভাবছে তার স্মৃতির সরণির কথা? এ সরণিতে যতবারই ভ্রমণ করেছে সে, ভোলেনি একবারও যে, জীবনের প্রথম ভালবাসা সে একজন কাপুরুষকে দিয়েছিল? এতদিন পরে অমিতাভকে দেখে করুণা কি ভুলতে চাইছে সে কথা? না কি মনে রাখতে চাইছে আরও বেশি করে?
আবার Isle of  Captri আর ‘ভুলি নি তো এক দিনও’-র নিরিখে, শুধু গান নির্বাচনের নিরিখে নয়, গায়নের নিরিখেও বিমল আর করুণার রুচি-পছন্দের ফারাকটা চেনা যায়। গত সন্ধ্যাতেই তার আভাস মিলেছিল। তখন চিত্রাঙ্গদার ‘হা হতভাগিনী’ উচ্চারণে করুণার রেডিও বন্ধ হয়েছে। বিমল গুপ্ত অতিথিকে তাঁর বাংলোর গেস্টরুম দেখিয়ে দেন, change করে নিতে বলেন। পানীয় সহযোগে সান্ধ্য relaxation-এর জন্য প্রস্তুত হতে নিজেও ওয়াশরুমে দরজা দেন। দরজা বন্ধর আগে বিমল গুপ্তর গলায় pre-relaxation গান ‘জনগণমন অধিনায়ক’। যখন ‘বঁধু, কোন্‌ আলো লাগল চোখে’ বা ‘ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে শুনি’ বাংলোর রেডিওতে বাজছে না, অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতিতে ‘চিত্রাঙ্গদা’  শুরু হতে না হতেই থেমে গেছে, বাংলোর মালিক জাতীয় সংগীত গেয়ে অসমাপ্ত ‘চিত্রাঙ্গদা’-র শেষ ঘোষণা করে দিচ্ছেন না তো? না কি ‘চিত্রাঙ্গদা’ শেষ হওয়া না হওয়া বিমল গুপ্তর কাছে তেমন জরুরি নয়? ওসব করুণার জগৎ! একটি রবীন্দ্রসংগীতেরই কয়েকটি কলিমাত্র তাঁর জানা? জাতীয় সংগীত? না বোধহয়।
রবিবারে গন্তব্যে পৌঁছনোর আগে মাঝপথে জিপ থামিয়ে করুণা আর অমিতাভকে হাত-পা ছাড়িয়ে নিতে বলেন তিনি। তার পর শিস দিতে দিতে জলের খোঁজে যান— জিপের মেশিনকে জল খাওয়াতে হবে। শিসের সুর মন দিয়ে শুনলে ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়’-এর রেশ পাওয়া যাবে। তবে কি করুণা গতরাতে স্বামীকে বলেছে তার আর অমিতাভর পুরনো গল্প? পিকনিক স্পটে যেতে যেতে বিমল তো বলেছেন অমিতাভকে যে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর একটা guessing game হয়েছে অমিতাভকে নিয়ে। করুণা নাকি বলেছে, চিত্রনাট্যকার অমিতাভ রায়ের নাম না জানলেও,  ওই নামে একজনকে সে জানত কলেজে পড়বার সময়ে। রবীন্দ্রসংগীত তবে বারবারই ‘কাপুরুষ’-এর চলনে নানান বিকল্প অর্থের সম্ভাবনা বুনে দেয় । বিমল জলের খোঁজে গেলে অমিতাভ করুণাকে বোঝাতে চায়, সে আর কাপুরুষ নেই। করুণা বিমল গুপ্তকে ছেড়ে তার কাছে এলে, আজ আর সে পিছু হটবে না। করুণা কি সত্যি ভেবেছিল অমিতাভর কথাকে? না কি ‘ভুলি নি তো এক দিনও’-তে সে নিশ্চিত এবং স্থিত? চলচ্চিত্রের অন্তিমে অমিতাভ দ্বিতীয়বার কাপুরুষ প্রমাণিত হয়। আর করুণা? সে কি অমিতাভকে বিশ্বাস করে স্টেশনে এসেছিল? ঘুমের ওষুধের শিশি ফেরত নেওয়াটা উপলক্ষমাত্র? অমিতাভ যে তার আগেই হাসিমারা যাওয়ার মাত্র একটা টিকিটই কেটেছে, সে যে এখনও কাপুরুষ, তা তো অমিতাভর দ্বিধাগ্রস্ত মুখ দেখেই করুণার বুঝবার কথা! না কি পিকনিক-এর বিশেষ দিনে বা বাংলোজীবনের প্রতিদিনের বাঁকে বাঁকে দ্বিতীয়বার কোনও ভুল করুণার হতেই পারে না। করুণার মনের কথা অজানা থেকে যায় । তার নূতন আভরণের তল অমিতাভ পায় না, দর্শকও পান না ।

সীমাবদ্ধ

এও কি এক জরুরি সংগত? ‘চিত্রাঙ্গদা’-র শ্রবণ অথবা সেই শ্রবণের বিরাম ব্যেপে শ্রোতার ব্যক্ত সংলাপের ধরন, অব্যক্ত নীরবতার চলন বহন করে ‘ভুলি নি তো এক দিনও’-তে পৌঁছনো? এ সংগতে গানের মুহূর্ত, কাহিনিচিত্রের দ্যোতনা আর জীবনের পারা না পারা একাকার হয়ে থাকে। রবীন্দ্রগানের প্রয়োগে, শুধু রবীন্দ্রসংগীতই বা বলছি কেন, যে কোনও গানের কিংবা সুরের প্রয়োগে সত্যজিতের সংযম আর সংবেদন শিক্ষণীয়। সুর প্রয়োগে তাঁর ঋজুতা  তাঁর চলচ্চিত্র-সংলাপ নির্মাণের  মতোই যথাযথ। ‘কাপুরুষ’-এর ছ-বছর পরের চলচ্চিত্র ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭১)। টুটুল অর্থাৎ সুদর্শনা তার জামাইবাবু শ্যামলেন্দুর সাফল্যের চুড়োয় পৌঁছনোর মারাত্মক পদ্ধতিটা বুঝে ফেলেছে, ওই সাফল্যকে সে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই উপলব্ধি আর প্রত্যাখ্যানের বিন্যাসে নীরবতাই মুখ্য। টুটুল কলকাতায় বেড়াতে আসার পরে তার শ্যামলদা তাকে ব্যবহার করতে দিয়েছিল নিজের বাড়তি হাতঘড়িটা, বলেছিল, পাটনা ফিরে যাওয়ার আগে ঘড়িটা ফেরত দিয়ে গেলেই চলবে। শ্যামলেন্দু কোম্পানির  ডিরেক্টর হয়ে বাড়ি ফিরবার পরে, বেশ কিছুক্ষণ পরে, সুদর্শনা যখন ঘর থেকে বেরোয়, তার গলায় মৃদু গুনগুন শোনা যায়; কথা নয়, কেবলই সুর— ‘তোমরা যা বল তাই বলো, আমার লাগে না মনে’। এইটুকুই, তার পর সে চেয়ারে বসে, হাতের ঘড়িটা খুলে শ্যামলেন্দুর সামনের টেবিলে রেখে দেয়, একেবারে নীরবে। বেহাগ কীর্তনের সূচনার কলিটুকু ছাড়া আর কোনও ধ্বনি নেই এ দৃশ্যে । সুদর্শনা যে চেয়ারে বসে ঘড়িটি খুলে দিয়েছিল তা ফাঁকা হয়ে গেল, শ্যামলেন্দু একা, সে দু’হাতে মুখ ঢাকে, তার মাথার ওপর ঘুরছে পিটার্স ফ্যান, তার কোম্পানির পাখা।
এমন সংযমে সত্যজিতের দর্শক অভ্যস্ত বলেই কি তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘আগন্তুক’-এ ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’ সম্পূর্ণ গানটির প্রয়োগ একটু শিথিল লাগে? শ্রমণা গুহঠাকুরতা (চক্রবর্তী)-র গায়ন একান্ত উৎকৃষ্ট, ভাগনি অনিলার গানে মনমোহনের তন্ময়তার পরম সংবেদনশীল অভিনয় উৎপল দত্তের, তবু গোটা গানটির ব্যবহারে চলচ্চিত্রের বার্তায় তেমন বাড়তি কোনও মাত্রা যোগ হল না। অবশ্য ভাবতে ভাল লাগে, যে কতদিন আগে, সেই ১৯৬৭-তে ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’-য়  রবীন্দ্রসংগীতের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে যে বারোটি গানের উল্লেখ করেছিলেন সত্যজিৎ (ওই), তার দু-দুটি ব্যবহার হল তাঁর শেষ কাহিনিচিত্রে— ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’ আর ‘অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহো প্রাণ’। বারোটি গানের তালিকায় শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রগানের নিদর্শনকে ধরানো সহজ নয়, সম্ভবও হয়তো নয়। কিন্তু ওই তালিকায় দুটি গানের অনুপস্থিতি পাঠককে কিঞ্চিৎ বিড়ম্বিত করে। ‘মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে’ আর ‘এ পরবাসে রবে কে হায়’। প্রথম গানটি অমিয়া ঠাকুরের কণ্ঠে শোনার স্মৃতি সুভাষ চৌধুরীর সঙ্গে সত্যজিতের কথোপকথনে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে; ও গানের সুরক্ষেপ এবং স্বরক্ষেপ প্রসঙ্গে অনেক জরুরি কথার হদিশ আছে সাক্ষাৎকারে (সত্যজিৎ রায়, ‘রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, পৃ. ১৪৬)। ‘শাখা-প্রশাখা’ চলচ্চিত্রে গানটির প্রথম কলি শ্রমণা গুহঠাকুরতা (চক্রবর্তী)-র কণ্ঠে ব্যবহারও হয়েছে । আর ‘এ পরবাসে রবে কে হায়’-এর প্রয়োগ তো ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় সর্বাপেক্ষা অর্থবহ মুহূর্তগুলির অন্যতম। তবু তারা সত্যজিতের বিচারে শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসংগীতের তালিকায় নেই।

আগন্তুক

এই না থাকার হেতু সম্ভবত প্রবন্ধটিতেই খুঁজে পাওয়া যায় তালিকাটির ঠিক আগে। সত্যজিৎ লিখেছেন : রবীন্দ্রসংগীতের যা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সেরা ছবির মতোই সতেজ, সাবলীল ও অননুকরণীয়। এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সম্বাদীর প্রশ্ন আসে না। এখানে সবই আছে, আবার সবই যেন নতুন। এমনকী এখানে কথা ও সুরের সামঞ্জস্যের বিচারটাও অবান্তর বলে মনে হয়, কারণ সব শ্রেষ্ঠ শিল্পরচনার মতোই এ গানও বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। (সত্যজিৎ রায়, ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’, পৃ. ৩৭৯)।
সত্যজিতের সুরসমৃদ্ধ শ্রবণে ‘মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে’-তে মিশ্র পূরবী ইমনের ‘প্রশ্ন’ আর ‘এ পরবাসে রবে কে হায়’-তে সিন্ধু কাফির ‘প্রশ্ন’ কি ‘সবই যেন নতুন’-এর পথরোধ করে দাঁড়ায়? তাই ‘শ্রেষ্ঠ নিদর্শন’-এর যে সংজ্ঞা তিনি নিজেই নির্মাণ করেছেন, তার নিরিখে গানদুটিকে তালিকায় রাখতে পারেন না?
লাবণ্যর গান ‘এ পরবাসে রবে কে হায়’ ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’–র বার্তায় আশ্চর্য মাত্রা যোগ করে। এখানেও কিন্তু পুরো গানটিই ব্যবহার হয়। আর দর্শকের, মনে হয়,  একটি শব্দ, একটি সুরক্ষেপ বাদ পড়লেও যেন চলচ্চিত্রের বিন্যাসে আঘাত লাগত। অমিয়া ঠাকুরের কণ্ঠে এ গানের মূর্ছনা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র পরম সম্পদ। পরবাসের আবর্ত ভাঙতে চাইছে সকলে— অণিমা, শংকর, মনীষা, লাবণ্য, এমনকি অশোকের মতো নিরুপায় বেকার যুবক। রায়বাহাদুর ইন্দ্রনাথ চৌধুরীর কর্তৃত্বের ঘেরাটোপকে পরবাস বলে চিনতে পারছে তারা, তাই কি শেষবেলায় কুয়াশা কেটে গিয়ে ঝলমল করে উঠছে কাঞ্চনজঙ্ঘা? ছোটমেয়ে মনীষার জন্য পাত্র হিসেবে যে ব্যানার্জিকে সদ্য মনোনীত করেছেন রায়বাহাদুর, সে বাজি ধরেছিল মনীষার সঙ্গে, যে— আজ বেড়ানোর শেষ দিনে কুয়াশা কেটে গিয়ে দেখা যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা । আকাশের অবস্থা দেখে ব্যানার্জি আগেই চকোলেটটা দিয়ে দিতে চেয়েছিল মনীষাকে, যেন হেরেই গেছে বাজিতে। সময়ের আগে জিতটা মেনে নিতে রাজি হয়নি মনীষা। কিন্তু সেই চকোলেট নেপালি ভিখারি বালকের হাতে এল কী করে? রায়বাহাদুর দেখছেন বালককে, সে খুশি মনে চকোলেট খাচ্ছে; আর গান গাইছে (ণি ধা মা পা রে রে রে [২]/মা গা সা রে সা দা দা [২]/সা সা রে সা সা সা ধা পা মা [২])। লোকসুর, যেখানে সাতটি স্বরই ব্যবহার হচ্ছে, ণি ছাড়া সবক’টিই শুদ্ধ। সুরের কাঠামোতে পড়ে নেওয়া যাচ্ছে সা-রে-মা-পা-ধা। অর্থাৎ এমন কোনও লোকসুরেই ‘পাহাড়ী’ নামের রাগটির উৎস হওয়া সম্ভব। ছেলেটার সানন্দ চকোলেট খাওয়া দেখতে দেখতে, স্বতঃস্ফূর্ত গান শুনতে শুনতে কেমন খটকা লাগে রায়বাহাদুরের— তবে কি কোথাও টান পড়ল তাঁর Lordship-এ? একটু আগেই অশোককে অবজ্ঞাভরে বলেছেন তিনি, এই জায়গাটা তো ছিল লেপচাদের একটা ছোট্ট গ্রাম, সেখানে যে গড়ে উঠল the first European city of Bengal, সে তো ইংরেজদের গৌরবময় কীর্তি! কথাটা কি ফিরে আসছিল রায়বাহাদুরের মনে, যখন তিনি দেখছিলেন সেই তুচ্ছ গাঁয়ের অবশেষ? শুনছিলেন তার ব্রাত্য সুরের ধ্বনি?

কাঞ্চনজঙ্ঘা

রায়বাহাদুর তো শোনেননি তাঁর সহধর্মিণীর কণ্ঠে ‘তেমন আপন কেহ নাহি এ প্রান্তরে’-র আর্তি! লাবণ্যর সরব-নীরব কোনও আর্তিই আজ পর্যন্ত তাঁর ধর্তব্যে এসেছে বলে মনে হয় না। লাবণ্যর ‘এ পরবাসে’ শুনেছিলেন জগদীশ, লাবণ্যর দাদা। ঘেরাটোপের বাইরের মানুষ তিনি, পাখির নেশায় পাগল। কতযুগ পরে বোনের গান শুনে পিঠে হাত রাখেন লাবণ্যর। লাবণ্য  যেন পরবাসের আর্তির ভিতরেই বলে ওঠেন, “দাদা!” সে উচ্চারণ যেন সিন্ধু কাফির অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়। দাদা-বোনের পরবর্তী সংলাপে মনে হয় লাবণ্য যেন ‘এ পরবাসে রবে কে হায়’ গাইতে গাইতেই ছোটমেয়েকে ভরসা জোগানোর জোর পেয়েছেন— গড়ুক সে নিজের মতো করে তার নিজবাস।
ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর বিপন্ন রায়বাহাদুরের সম্মিলনে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’  চলচ্চিত্রের সমাপ্তি । তখন ১৯৬২ সাল। পরের দশকের গোড়ায় বা সেই দশকেরই একেবারে শেষে সত্যজিতের ‘কলকাতা ত্রয়ী’–র নির্মাণ শুরু । ১৯৭০-এ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ’৭১-এ ‘সীমাবদ্ধ’, ’৭৫-এ ‘জন অরণ্য’। ইতিবাচক ইঙ্গিতে চলচ্চিত্রের, শুধু চলচ্চিত্রেরই বা কেন, যেকোনও শিল্পেরই অন্তিম বার্তা নির্মাণ ক্রমশ দুরূহ থেকে দুরূহতর হচ্ছে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র অশোকের কাজ খোঁজা আর ‘জন অরণ্য’-র সোমনাথের কাজ খোঁজার ভিতরে দুস্তর ব্যবধান। ‘জন অরণ্য’ প্রসঙ্গেই শেষ করব। কিন্তু তার আগে একবার ফিরে যাব সেই চলচ্চিত্রে, যার সূচনা অপূর্বকুমারের জীবিকা অন্বেষণের কলকাতায়। ‘অপুর সংসার’, ১৯৫৯ সাল। ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’ লিখতে তখনও আট বছর দেরি। ‘অপুর সংসার’   সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র যেখানে ব্যবহার হল রবীন্দ্রসংগীতের সুর। বন্ধু পুলুর মামাবাড়িতে  যাওয়ার পথে নৌকায় অপু বাঁশি বাজাচ্ছে, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।/চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’।। এ দুটি চরণ বাজিয়েই অপু ধরে, ‘কী শোভা, কী ছায়া গো…’,  বাজিয়েই বাঁশি নামিয়ে রেখে অপু যায় রবীন্দ্রকবিতার কাছে। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’-র আবৃত্তিতে অপু যখন বলে, ‘যখনই শুধাই ওগো বিদেশিনী, তুমি হাসো শুধু মধুরহাসিনী’, নৌকার বুড়ো গালভাঙা মাঝি দাঁড় বাইতে বাইতে ফোকলা হাসি হাসে। বাঁশিতে যতই বাজাক অপূর্বকুমার ‘আমার সোনার বাংলা’, কোথাও কি অসংগতি আছে অপূর্বকুমারদের দেশাত্মবোধে, তাদের শিল্প-সাহিত্য-মনস্কতায়!

অপুর সংসার

দ্বিতীয় যে সুরটি, তার অনুষঙ্গে কি ‘অপুর সংসার’-এর মূল বার্তাকে স্পর্শ করা যায়? ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে/এই নব ফাল্গুনের দিনে— জানি নে, জানি নে’, এই কলিটুকু একবারই বাজায় অপু বাঁশিতে। অপর্ণা তখন সহায়সম্বলহীন অপুর নিম্নবিত্ত গৃহস্থালিকে নিজের করে নিয়েছে । কে বলবে, সে গ্রামের জমিদারবাড়ির মেয়ে! সকালে উঠে উনুন ধরাচ্ছে, তার কয়লা ভাঙার শব্দ থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরোনো উনুন ছাদে বয়ে নিয়ে যাওয়া, দর্শক শুনছেন, দেখছেন। আর শুনছেন, অপুর বাঁশি। পিলু-খাম্বাজ নির্দেশ স্বরলিপির শুরুতে থাকলেও, গানের ওই সূচনার কলিতে খাম্বাজকেই মূলত চেনা যায়। এও কি এক সংগত? অপর্ণার গৃহকর্মের কর্কশতা আর অপুর বাঁশির পেলবতা, কে কার সংগত করে? অপু যেন এমন সংগতের অসংগতি অনুভব করেই থেমে যায়। তখন অপর্ণার দায়িত্ব অপুকে বোঝানো, যে, না, এ সংগতে কোনও অসংগতি নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে আলোয় অপু স্নাত, আধুনিকতার যে অঙ্গীকারে সে এক আশ্চর্য উপন্যাস লিখছে, সে আলোর, সে অঙ্গীকারের শরিক অপর্ণা নয়। কিন্তু অপূর্বকুমারদের আধুনিকতাকে প্রাক্‌-আধুনিক লালনে অপর্ণারা ভরিয়ে রাখলে তবেই না অপুর আশ্চর্য উপন্যাসের নায়ক ভাবতে পারে, বাঁচার মধ্যেই সার্থকতা! অপর্ণার জীবনকালে অপু কি সত্যিই চিনেছিল অপর্ণাকে? কতটুকু চিনেছিল? না কি অপর্ণার অকালমৃত্যুর আঁধারে প্রথমে জীবন থেকে পালাতে চেয়ে, পরে শহর কলকাতা থেকে পালিয়ে, আশ্চর্য উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে অপু ক্রমাগত বুঝতে থাকে, আধুনিকের জীবনমুখিনতায় প্রাক্‌-আধুনিক অপর্ণাদের অবদান কতখানি! আগে যদি এতখানি বুঝত তবে ভক্ত ধ্রুবের কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্রে অপর্ণার নিবিষ্ট মুগ্ধতায় সে কি কেবল ঠাট্টার হাসি হেসেই ক্ষান্ত হত? নিশ্চয় অপর্ণার কাছে জানতে চাইত তার তদ্‌গত মুগ্ধতার কারণ!

অপর্ণা তো অপুকে চিনে নিয়েছিল! না হলে কি বলত সে, তার গরিব বর সন্ধের আগে বাড়ি ফিরে এলেই সে খুশি, টাকাপয়সা দাসদাসীর অভাবে আফশোস নেই তার! অপু-অপর্ণার গৃহস্থালি শুরু হওয়ার আগে, তাদের ফুলশয্যার রাতে, অপর্ণার বাপের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে নৌকা বাইছিল মাঝি, অস্পষ্ট ভেসে আসছিল মাঝির গান, অপু-অপর্ণার আলাপের আবহে— ‘ও বন্ধুরে কেউ যাইও না জলের ঘাটে কলসী কাঁখে নিয়া… বন্ধুরে আগে যদি জনতাম রে বন্ধু যাইবারে ছাড়িয়া, আমি শাড়ির আঞ্চল দিয়া রাখিতাম বান্ধিয়া রে বন্ধু… ওরে বন্ধু মাও ছাড়লাম, বাপ ছাড়লাম, ছাড়লাম দ্যাশের মায়ারে তুমারো কারণে বন্ধু …’। অপর্ণার জন্য অপুকে ছাড়তে হয়নি কিছুই, অপর্ণা ছেড়েছিল তার অভ্যস্ত জীবন। আর অপর্ণা যে ছেড়ে চলে যাবে তাকে, সে কথা তো অপুর দুঃস্বপ্নেও ছিল না। তাই অনেক জানাচেনা বাকি থেকে গিয়েছিল। কোথাও কি ‘অপুর সংসার’-এ মাঝির এই গানের সঙ্গে সওয়াল-জবাব চলে রবি ঠাকুরের পরিশীলিত কথা-সুরের : ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে’? এমনকি ও গানের যে অংশ এ চলচ্চিত্রে কোনওভাবেই উচ্চারিত নয়, সেই ‘সে কি মর্মে এসে ঘুম ভাঙাবে’ বা ‘গোপন কথা নেবে জিনে’-র নীরব অভিঘাত কি স্পর্শ করে মাঝির গানকে, যখন সেই গান স্পষ্টতর শোনা যায় অপু আর তার ছেলে কাজলের প্রথম দেখা হওয়ার আবহে?
অপর্ণার মৃত্যুশোকে, নিরুপায় ক্রোধে, অভিমানে ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করেছিল অপূর্বকুমার। পাঁচ বছর বয়স হয়ে গেছে ছেলের, যখন বাবা তাকে প্রথম দেখছে। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে ছেলেকে রাখার ব্যবস্থা করেছে, তার পর সে নিজে যাবে বাইরে, তাই অপু শ্বশুরবাড়িতে এসেছে দীর্ঘদিন পরে, ছেলেকে নিয়ে যেতে। সদ্য জ্বর থেকে উঠে পথ্যি পাওয়া কাজল একলাটি ঘুমোচ্ছিল মা-বাবার ফুলশয্যার সেই ঘরে। অপু ঘরে ঢোকে, ঘুমন্ত ছেলেকে দেখে, জীবনে এই প্রথমবার, বসে সে কাজলের মাথার কাছে, চেয়ারে। নদী থেকে ভেসে আসছে মাঝির গান— ফুলশয্যার রাতে যেন এত স্পষ্ট শোনেনি অপু এ গান। অপূর্বকুমারের নতুন বোধোদয়ের সূচনা কি এখানে? কাজল বাপের এতদিনের প্রত্যাখ্যানের বদলা নেয়, অপুর পক্ষে সহজ হয়নি তার মন পাওয়া। ‘… ছাড়লাম দ্যাশের মায়ারে তুমারো কারণে বন্ধু’— মাঝির এই সনাতন গানের রেশ ধরেই কি আধুনিক অপূর্বকুমারকে বিদেশের মায়া, বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হয়? “বাবা আমায় বকবে না?… আমায় ফেলে চলে যাবে না?”-র উত্তরে স্বতঃস্ফূর্ত বলে ওঠে অপু “কখ্‌খনো না।” এতদিনে কি অপূর্বকুমারের মর্মে এসে কেউ ঘুম ভাঙাল? এতদিনে কি সে বুঝতে পারল ঠাকুরপুজোর জীবিকা প্রত্যাখ্যান করে কলকাতার কলেজে-লাইব্রেরিতে-গড়ের মাঠে জেগে ওঠা, ভক্ত ধ্রুবকে কেন্দ্রে রেখে যে বায়োস্কোপ, তার ছিরিছাঁদকে বিদ্রূপ করে ‘সধবার একাদশী’ বা অনুরূপ কোনও বিনোদনে জেগে ওঠা, এই জাগরণের মধ্যেও আছে আচ্ছন্নতা, নিদ্রা? কাজলকে কোলে নিয়ে কি অপুর ঘুমের সেই মর্মভেদী ভাঙন? অপু কি বুঝছে, এতদিন সে যত দায়িত্ব নিয়েছে, সে দায়িত্ব নেওয়ার অপর নাম ছিল অপুর নিজের লালন পাওয়া? এবার তাকে লালন করতে হবে। একরত্তি ছেলেটা কি অপূর্বকুমারের অবচেতনের সব গোপনকে জিনে নিতে শুরু করে দিল? কাজলের অচেনা কোন এক নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে কাজলের ব্যবস্থা করে বিদেশে পালানো চলবে না। অপুকে নিজের হাতে গড়ে দিতে হবে কাজলের নিশ্চিন্দিপুর। কবে কোনকালে বাঁশিতে বাজানো ‘যদি তারে নাই চিনি গো’-র অনুক্ত কলি কি বিছিয়ে রইল চলচ্চিত্রে? আপাত-অমিল নিয়ে ‘…আগে যদি জানতাম রে বন্ধু যাইবারে ছাড়িয়া…’ কোথাও কি মিলে গেল ‘যদি তারে নাই চিনি গো’-র সঙ্গে? রবীন্দ্রসংগীতের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের মধ্যে সত্যজিৎ রেখেছিলেন ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে’ গানটি (সত্যজিৎ রায়, ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’,  পৃ. ৩৭৯)। ‘অপুর সংসার’  তৈরি হওয়ার পরে তখন কেটে গেছে আট-আটটি বছর।

জন অরণ্য

১৯৫৯-এর ষোলো বছর পরে ‘জন অরণ্য’-তে সোমনাথ চাকরি খুঁজে খুঁজে হয়রান। বিএ পরীক্ষার ফল আশানুরূপ হয়নি। শেষপর্যন্ত ভিড়ে গেল অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজে। অপুর চাকরি খোঁজার দিন-দুনিয়া আর নেই । দেশের স্বাধীনতা সাবালক হয়েছে, আবার কেউ কেউ বলে, এ স্বাধীনতা আদতে স্বাধীনতাই নয় । সোমনাথ অফিসে অফিসে কাগজ-কার্বন-খাম-টিউবলাইটের অর্ডার সাপ্লাই করতে করতে শেষে textile-cleaner এক chemical-এর বড়সড় অর্ডারের মুখোমুখি হল, যা তার রুজির অনিশ্চয়তা লোপাট করে দিতে পারে। আজকাল যে অর্ডার, ব্যবসা, চাকরি, কোনও কিছুই ঘুষ ছাড়া হয় না, সে কথা সোমনাথের বৃদ্ধ পিতা মানতে বা ভাবতে নারাজ। সোমনাথের চাকুরে দাদা বলে, ঘুষ কোনও নতুন ব্যাপার নয়, উৎকোচ শব্দটা যখন সংস্কৃতে আছে, তবে তো সেই সনাতন যুগেও ঘুষ ছিল! বাইরের সব কথা বাবাকে খুলে বলা অসম্ভব। বাবার সঙ্গে ছেলেদের দূরত্ব বাড়ে। গত শতকের সাতের দশকে শহর কলকাতার সন্ধ্যাগুলো নিষ্প্রদীপে অভ্যস্ত ছিল। সোমনাথ বাড়ি ফিরেছে বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে। মোমবাতির আলোয় ট্র্যানজিস্টরে রবীন্দ্রসংগীত শুনছেন সোমনাথের বাবা, তাঁর চিন্তাক্লিষ্ট বিষণ্ণ মুখের আবহে গান শুরু হয় ।
নটবর মিত্র, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, আজ সোমনাথকে জানিয়ে দিয়েছেন, আগামীকাল chemical-এর অর্ডার নিশ্চিত হয়ে যাবে, যদি সে কেজরিওয়াল কটন মিল-এর গোয়েঙ্কাকে ঠিকঠাক ‘physical’ provide করতে পারে।  গোয়েঙ্কা শহরে আসবে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট হোটেলে, নির্দিষ্ট কামরায়  যদি সঙ্গিনী পৌঁছিয়ে দিতে পারে, তবে গোয়েঙ্কার সই করা চিঠি তার হাতে আসবে, সে অর্ডার পাবে। নটবর নিত্রের ভাষায়, chemical-এর জন্য physical। গোয়েঙ্কা টাকার জন্য কেজরিওয়ালের যে মেয়েকে বিয়ে করেছে, তার পোলিও হয়েছিল শৈশবে । ওই physical-টুকু গোয়েঙ্কার প্রয়োজন হয়, না হলে সে-ই বা খামোখা বর্তমান সাপ্লায়ারের তিন পার্সেন্ট কমিশন sacrifice করে নতুন লোককে অর্ডার দেবে কেন?
বাড়িতে জানে যে, সোমনাথের সুদিন আসছে। ঘুষ ছাড়া কিছুই হয় না, এমন ধারণাকে বাস্তব ভাবতেই সোমনাথের বাবার অস্বস্তি। আর কী পদ্ধতিতে ছোটছেলের সুদিন আসা সম্ভব, সে তো তাঁর দুঃস্বপ্নেরও অতীত। ট্র্যানজিস্টর রেডিওতে বাজছে, ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে গগনে গগনে ডাকে দেয়া’। এই রবীন্দ্রগানটি পিলু রাগে স্থিত। উপশাস্ত্রীয় সংগীতে সচরাচর ব্যবহৃত এই মধুর রাগটির আরোহণে দুটি বিকল্প চলন আছে— নি-সা-গা-মা-পা-নি-সা অথবা ন-সা-রে-মা-পা-নি-সা। আরোহণে শুদ্ধ স্বর । আর অবরোহণে সা-ণি-ধা-পা-মা-জ্ঞা-রে-সা, অর্থাৎ জ্ঞা আর ণি কোমল। এই যে সম্মিলন শুদ্ধ আর কোমলের, তা যেন সুরের মাধুর্য আর সারল্যকে লালন করে। গানের বাণীতেও বিছিয়ে আছে বর্ষণসম্ভব দিনের রোমান্সটুকু। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ৩রা শ্রাবণ বর্ষামঙ্গল উপলক্ষে শান্তিনিকতনে যে পনেরোটি গান গাওয়া হয়েছিল, একই বছরে ‘বর্ষামঙ্গল’ শীর্ষক গীতিপুথিকায় স্বরলিপি সমেত যে পনেরোটি গান মুদ্রিত হয়েছিল, তার অন্যতম এই ‘ছায়া ঘনাইছে’। এর রচনা ১৩৩২-এর দু’বছর আগে (পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতবিতান তথ্যভাণ্ডার’,  সিগনেট প্রেস,‌ ২০১৯, পৃ. ৩১৬-১৭)। ওই পনেরোটি গানের মধ্যে ছিল পিলু-মূলতানে বিন্যস্ত ‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার’-এর মতো গান (ওই, পৃ. ২৮-২৯) । কিন্তু সত্যজিৎ অর্ডার সাপ্লায়ার সোমনাথ ব্যানার্জির আদর্শবাদী পিতাকে পিলুর মধুরতায় আর ছায়ার অস্পষ্টতায় ভুলিয়ে রাখলেন।  পাশাপাশি থাকল ওই গানের কথা আর সুরের সঙ্গে সোমনাথ আর তার বউদির কথাবার্তা। এ সংগতে যে বিপ্রতীপ তৈরি হয়, তেমন কি আর খুব পড়া গেছে সত্যজিতের নির্মাণে?
‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে গগনে গগনে ডাকে দেয়া’-র স্থায়ী অংশটি যখন দ্বিতীয়বার গাইছেন শিল্পী, পাশের ঘরে মোমবাতির আলোছায়ায় সোমনাথকে তার বউদি শুধোয়, “বাবাকে কিছু বলার আছে?” সোমনাথ প্রশ্ন করে, “কেন?” গান পৌঁছয় ‘কবে নবঘন-বরিষণে গোপনে গোপনে এলি কেয়া’-য়, আর বউদির কথায় যেন তার সংগত, “উনি কিন্তু নিজে থেকে কিছু বলবেন না, বুড়োমানুষ, দুটো কথা বললে যদি খুশি হন।” অর্থাৎ অর্ডারটা যে সোমনাথ পেয়ে গেছে, বা শিগগিরিই পেয়ে যাবে, এ কথাটা বৃদ্ধকে বলে আশ্বস্ত করুক সোমনাথ, এমনটাই বউদির ইচ্ছা। কিন্তু ‘গোপনে গোপনে এলি কেয়া’-র রেশ মিশে গেল সোমনাথের উত্তরে, “এখন পারব না বৌদি, বলার মতো কিছু নেই।” বউদি প্রশ্ন করে, “তোমার কী হয়েছে বল তো?” ‘কেয়া’-র স্বরক্ষেপ পঞ্চম-ধৈবত পে‍রিয়ে, কোমল ণি ছুঁয়ে আবার স্থায়ীর ‘ছায়া’-কে স্পর্শ করতে পঞ্চমে ফেরে । সোমনাথ বলে, “সব কীরকম গোলমাল হয়ে গেল।” বউদি যেন পিলুর মূর্ছনার মতোই সরল আর মধুর, “তুমি কি এখনো পরীক্ষার কথা ভাবছ?” অন্তরায় যাওয়ার আগে আর একবার ছোঁয়া হচ্ছে স্থায়ীকে, সচরাচর যেমন হয় রবীন্দ্রগানে, সোমনাথ বলে, “কী ভেবেছিলাম আর কী হয়ে গেল!” “এই তো বললে ভালো সময় আসছে, এখন আবার এ-সব কথা কেন?”— স্বাভাবিক প্রশ্ন বউদির। “আমার কাজটা খুব বাজে, বৌদি”, বলতে বলতে সোমনাথ মোমবাতির শিখা থেকে দেশলাই জ্বালায়। “বাজে?” বউদির গলায় বিস্ময়। “কী কাজ জান?” সোমনাথ তাকিয়ে আছে নিজের হাতে ধরা জ্বলন্ত দেশলাইয়ের দিকে। গান পৌঁছয় অন্তরায়। ‘পূরবে নীরব ইশারাতে’— ‘পূরবে’-র সুরে উপরের ‘সা’ থেকে তারার মধ্যম হয়ে ফেরার পথে লেগেছে কোমল গান্ধার, ‘নীরব ইশারা’ ঘোরাফেরা করছে রে-সা-নি-সা-য়। বউদি সোমনাথের প্রশ্নের উত্তরে বলে, “তুমিই তো বললে, অর্ডার সাপ্‌-লাই তো?” “ওর একটা বাংলা নাম আছে”, বলে সোমনাথ, তার হাতের দেশলাই কাঠি তখনও জ্বলছে। বউদি জানতে চায়,  “কী?” সোমনাথ উত্তর দেয়, “দালালি।” সোমনাথের এই উচ্চারণের অনুষঙ্গেই যেন ‘একদা নিদ্রাহীন রাতে’-র বিন্যাসে  ‘একদা’ তারা থেকে মুদারায় নামে, ‘নিদ্রাহীন-এর স্থিতি কোমল ‘ণি’-তে, আর কোমল ‘ণি’ থেকে ধৈবত হয়ে পঞ্চমে পৌঁছয় ‘রাতে’-র সুর । অন্তরা যখন দ্বিতীয়বার গাইছেন শিল্পী, বউদির দেওয়া সান্ত্বনা যেন কোমল ‘ণি’, কোমল ‘জ্ঞা’-র স্পর্শ পাওয়া পিলুর অবরোহণের মতোই পেলব আর মধুর— “নামটা তো আর তুমি দাওনি। ওটা নিয়ে ভাবছ কেন?” সোমনাথ বলে, “কাজটাও খারাপ, বৌদি।” বউদির সান্ত্বনাদানে কোনও বিরাম নেই— “কাজটা তো তুমি শখ করে করছ না, ঠেকায় পড়ে করছ।” “সেটা কে বুঝবে বল?” কেমন যেন ভেঙে পড়া গলা সোমনাথের। বউদি বলে, “তুমি যাই করো না কেন, আমি কিন্তু তোমায় খারাপ বলব না।” বউদির এই উচ্চারণ  মেশে ‘হাওয়াতে কী পথে দিলি খেয়া’য়; পঞ্চম থেকে তারা-র ‘রে’ পর্যন্ত এগিয়ে শেষে পঞ্চমে ফেরা, ফেরার পথে কোমল ‘ণি’-র অব্যর্থ প্রয়োগ। সোমনাথ বলে, “তোমাকে বোঝানো বড় শক্ত, বৌদি।” ‘আষাঢ়ের খেয়ালের কোন খেয়া’-য় পিলুর নিয়ম ভেঙে আরোহণে লাগে কোমল ‘ণি’,  শেষে গান্ধার-মধ্যম-পঞ্চম-ধৈবত আর কোমল ‘ণি’ স্পর্শ করে পঞ্চমে ফেরে স্থায়ীর ‘ছায়া’-কে পেতে। ওই ‘আষাঢ়ের খেয়ালের কোন খেয়া’-র মধ্যেই তড়িঘড়ি প্রশ্ন বউদির, “কী বোঝাতে চাইছ বল তো? টাকা চাই? আজকাল যে সব ব্যাপারেই সেলামি লাগে, সেটা কি তোমার বৌদি জানে না?” মেঘাচ্ছন্ন গান আর তার পেলব মধুর সুর এতক্ষণ কি বউদির সান্ত্বনাবাণীর সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে চাইছিল সোমনাথের বিষাদের জমিতে? বউদির তরফে ধানচালের বোধে এতটা দীর্ণ এই প্রশ্ন কি সেই পেলবতায় আঘাত হানল? এবং নিষ্প্রদীপ শেষ, আলো এসে গেছে।

“যাক বাবা”, বউদি হাঁফ ছাড়ে, তার পর জের ধরে দেওরের কথার, “দালালি দালালি করে অত ভেব না তো।” আলো এসে যেন সোমনাথেরও ভার খানিক নেমেছে— “বাড়ি ফিরে এসে অন্ধকার দেখলে মেজাজটা এমনিতেই বিগড়ে যায়।” সোমনাথের কথার পিঠে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভায় বউদি, বলে, “তোমার দাদাকে জিজ্ঞেস কর, দালালির একটা সংস্কৃত নাম বলে দেবে, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” সেই যে উৎকোচের প্রসঙ্গ উঠেছিল খাবার টেবিলে, সে কথাই মনে করায় বউদি। সোমনাথের ভার কি আবার বাড়তে থাকে? তার বউদি তো জানে না, রুজির অনিশ্চয়তা যদি সে সত্যিই সামাল দিতে চায় তবে কতটা মারাত্মক হবে তার দেয় সেলামি! পাশের ঘরে বৃদ্ধ কিন্তু তখনও শুনছেন, ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’। অন্তরা শেষ করে নিয়মমতো আবার স্থায়ীতে ফিরেছে গান। ঘর থেকে বেরোনোর আগে বউদি বলে, “আর অর্ডারটা পেলেই তোমার জন্য একটা পাত্রী দেখছি, এ-ও বলে রাখলাম।” ঘরে সোমনাথ একা, পরীক্ষা পাশের পর যে হাতঘড়িটা দিয়েছিল বউদি, বাঁ হাতের মণিবন্ধ থেকে সেটা খোলার জন্য সে ডান হাতটা তোলে। ভেসে আসে গানের  সঞ্চারী, ‘যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা’। তার পরেই  দৃশ্যান্তরে কর্মব্যস্ত, যানবাহনমুখর কলকাতা। গান আর শোনা যায় না। কাহিনিচিত্র পৌঁছে গেছে পরের দিনে; যেদিন ঠিক বিকেল চারটেয় অফিসে সোমনাথ ব্যানার্জি গোয়েঙ্কার ফোন পাবে। জানাবেন তিনি, শহরে এসে কোন হোটেলে উঠেছেন, সঙ্গলাভের সমীচীন সময়টাও জানিয়ে দেবেন।
এবং দিলেনও। বউদির দেওয়া হাতঘড়ি বন্ধক রেখে তিনশো টাকা নিয়ে (নটবর মিত্র টাকাটা সঙ্গে রাখতে বলে দিয়েছিলেন আগের দিন) নটবর মিত্রের সহযোগিতায় গোয়েঙ্কার নৈশসঙ্গিনীর (গোয়েঙ্কা অবশ্য দশটার বেশি রাত করেন না, তাঁর ডাক্তারের কড়া নির্দেশ!) ব্যবস্থা করতে বেরোয় সোমনাথ। ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ গানটির সঞ্চারীতে ‘যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা’-র পরের কলি ‘…কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা’। তার পর আভোগ ‘বুঝি এলি যার অভিসারে মনে মনে দেখা হল তারে,/আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া—/আপনায় লুকায়ে দেয়া-নেয়া’। গানের এ-অংশ শোনা যায় না ‘জন অরণ্য’  চলচ্চিত্রে। কিন্তু  অশ্রুত অংশটি কি সত্যিই অনুক্ত? না কি নীচের ‘সা’ থেকে মুদারার গান্ধার-মধ্যম-পঞ্চম হয়ে পুনরায় মধ্যমে স্থিত হল যে মধুমাখা হৃদয়ের খবর, তার ক্ষতবিক্ষত অবয়ব কোমল গান্ধার স্পৃষ্ট অবরোহণের মূর্ছনার বদলে তৈরি হল সোমনাথের বড় অর্ডার পাওয়ার ব্যবস্থাপত্রের বিন্যাসে? বউদির দেওয়া হাতঘড়ি বাঁধা রেখে গোয়েঙ্কার সঙ্গিনীর মূল্য সংস্থান! এই কি ‘কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা’-র গ্রন্থনা? আগের দিন নটবর মিত্র সোমনাথকে বলেছিলেন, গোয়েঙ্কা ফোন করলে যেন সোমনাথ হোটেলের নামটা আর সময়টা জেনে নেয়। সোমনাথ তখন সদ্য জেনেছে, অর্ডার পাওয়ার জন্য কী সেলামি দিতে হবে তাকে। খানিকটা বিহ্বলভাবেই সে জানতে চেয়েছিল, কীসের সময়। নটবর হাসে, বলে, অভিসারের। যে মেয়েটি হোটেলে গোয়েঙ্কার কামরায় ঢুকে গেল আর সোমনাথের অর্ডার নিশ্চিত হল, পাকেচক্রে সে সোমনাথের নিকট বন্ধুর ছোটবোন । তিনশো টাকা হাতে নেওয়ার আগে কণা বলেছিল, “বেশি দিচ্ছেন।” কণার এক রাত্রির মূল্য আড়াইশো টাকা। উত্তরে সোমনাথ বলে, “ঠিক আছে।” কণা আর কিছু না বলে পুরো টাকাটা ব্যাগে রাখে। নটবর মিত্রের ‘অভিসারের’ উচ্চারণ থেকে সোমনাথের  অর্ডার পাওয়া পর্যন্ত যা যা ঘটে গেল, তা কি ‘বুঝি এলি যার অভিসারে মনে মনে দেখা হল তারে’-র মূর্ছনায় বাঁধা ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’-র অসামান্য আভোগকে নিরর্থে, ক্লেদে, আবর্জনায় ডুবিয়ে দিল না? বর্ষণমুখরতার মনোরম দৃশ্যকল্প আর পিলুর শুদ্ধ মধুর সারল্য এমন সংগতের ক্লেদ বইতে পারে কখনও? রবীন্দ্রসংগীতের প্রয়োগে এবং সেই প্রয়োগ থেকে নিঃশব্দ বিরামে এত নির্মমতা সত্যজিতের নির্মাণে আর দেখা যায়নি।
এখনও বাকি আছে গানের সর্বশেষ চরণ— ‘আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া—/আপনায় লুকায়ে দেয়া-নেয়া’। যখন সোমনাথের বন্ধু সুকুমারের (সোমনাথ আর সুকুমার একসঙ্গেই চাকরি খোঁজা শুরু করেছিল, এখন সোমনাথ অর্ডার সাপ্লায়ার আর সুকুমার ট্যাক্সিচালক) বোন কণা নিজের আজন্মের নাম কণাকে আড়াল করে যূথিকা-পরিচয়ে ঢুকে যায় গোয়েঙ্কার কামরায়, অবশ্যই স্বেচ্ছায়, মুশকিল আসান হয় সোমনাথের রুজির। নটবর মিত্র তাঁর জনসংযোগ-বিশেষজ্ঞতায় সঠিক বলেছিলেন, গোয়েঙ্কার ‘কাজ’ শেষ হয়ে গেলেই সোমনাথ পাবে গোয়েঙ্কার সই করা চিঠি, যার ভিত্তিতে  chemical-এর অর্ডার তার হাতে আসবে । হলও তাই। রাতে বাড়ি ফিরে সোমনাথ তার আদর্শবাদী বৃদ্ধ বাবাকে বলল, “ওটা হয়ে গেছে, অর্ডারটা পেয়ে গেছি।” পাওয়ার পদ্ধতিটা আড়ালে রইল, বৃদ্ধের মুখে নিশ্চিন্তির হাসি, বলেন, “বৌমা, ভোম্বল এসেছে।” বউদির মুখে হাসি নেই; সোমনাথের সাফল্যের আড়ালে কোন দেওয়া-নেওয়া ঘটে গেছে, তার পুরোটা সে জানে না । কিন্তু আগের সন্ধ্যায় ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’-র রেশ কানে নিয়ে নিষ্প্রদীপের ছায়ায় যে কথাবার্তা হয়েছিল তার আর সোমনাথের, আর আজ যে ভঙ্গিতে সোমনাথ নিজের সাফল্যের বার্তা ঘোষণা করল, সব মিলে সে বুঝছে, আড়ালের গল্পটা খুব হালকা নয়।
১৯৬৭-তে সত্যজিতের প্রবন্ধে শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসংগীতের তালিকায় ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’ ছিল না। ১৯৮১-তে প্রথম প্রকাশিত, রবীন্দ্রসংগীত প্রসঙ্গে সুভাষ চৌধুরীর নেওয়া সত্যজিৎ রায়ের  সাক্ষাৎকারেও এ গানের কোনও স্বতন্ত্র উল্লেখ নেই। যে রাগে মধুরতাই মুখ্য, সরলতাই বিশেষত্ব, যে রাগকে আজ পর্যন্ত কোনও ধ্রুপদী শিল্পী তাঁর অনুষ্ঠানের মুখ্য অংশে রাখেননি, সেই রাগের মূর্ছনাকে মর্মান্তিক জীবিকাযাপনের বিপ্রতীপে ব্যবহার করলেন সত্যজিৎ। যে গানের বাণী প্রকৃতির আশ্চর্য ব্যাপ্তি আর হৃদয়ের উষ্ণ উদ্বৃত্তের দেওয়া-নেওয়ায় স্থিত, তাকে দুরূহ আঁধারের উপমা করে তুললেন। কোন ভাবনা থেকে সত্যজিৎ নির্বাচন করেছিলেন এই গান ‘জন অরণ্য’–র জন্য, সে তথ্য আমাদের নাগালে নেই। কিন্তু শর্মিলা রায় পোমোর বিশিষ্ট গায়নে গানটির প্রয়োগ দর্শককে এ গানের শ্রুত এবং অশ্রুত অংশের ব্যক্ত-অব্যক্ত মূর্ছনায় সিনেমাটা দেখবার একটা চলন বাতলে দিল কি? দেখার এই ধরন নিশ্চয়ই চলচ্চিত্রটি দেখবার বহু বিকল্প ধরনের একটি। কেউ এই ধরনটির সঙ্গে সহমত না-ই হতে পারেন। তেমন অসহমত থেকে শুরু হতে পারে আরও নতুন দেখা, নতুন আলোচনা।

১৬ জুলাই ২০২২ তারিখে ইন্দুমতী সভাগৃহে ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন’ শিরোনামে প্রদত্ত সপ্তম সুভাষ চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা।
কৃতজ্ঞতা : পার্থ বসু, সুদক্ষিণা ভট্টাচার্য

 

মতামত জানান

Your email address will not be published.