বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

অনন্তবালা বৈষ্ণবীর গান

গান গেয়ে ভিক্ষা করতে করতেই শহর কলকাতায় ইসমাইল নামের এক গানপাগল তরুণ তাঁকে নিয়ে যায় শালিমার কোম্পানি আয়োজিত এক গানের আসরে, পারিশ্রমিক দশ টাকা। ওই আসরে ছিলেন গুরুধারার গায়ক মঙ্গল ফকির। অনন্তবালার গান শুনে মুগ্ধ ফকির তাঁকে শিষ্যা করে নিলেন।

গৌতম অধিকারী

 

সেদিন শীতভোরের বগুলা রেলওয়ে স্টেশনটা ঠিক কতটা স্তব্ধতা নিয়ে চুপচাপ তখনও আড়মোড়া ভাঙছিল আজ আর মনে নেই। মনে নেই, কুয়াশা কতটা পুরু হয়ে চাদরের মতো জড়িয়ে থেকেও গঞ্জ-শহরটার গা-গতরে শীতটাকে আরও জমাট করে তুলছিল। শুধু মনে আছে, স্টেশনে ঢোকার প্রবেশদ্বারে ছোট্ট রেলওয়ে পার্কটির চারপাশে গজিয়ে ওঠেনি তখনও কোনও টঙি-দোকান। পার্কের কোমরসমান প্রাচীরটা টপকে মুঠো মুঠো সবুজ তখনও দৃশ্যমান। এমনকি শিশিরের ভারে শিউলি ঝরে পড়ার শব্দটুকুও শ্রুতি এড়িয়ে যায় না। এমনই এক ভোরবেলায় টুপটাপ শিশিরের শব্দ গায়ে মেখে আমরা দু’জন— আমি এবং কমলদা (প্রামাণিক) আরও একটা নৈমিত্তিক সকাল দেখতে বগুলা স্টেশন, হাইস্কুলের মাঠে ঘুরছিলাম। আর ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ সংস্কৃতিচর্চার দরজায় ঠোক্কর দিয়ে চলছিলাম পথ। সেই ‘ঠোক্করময়’ পথের দু’ধারের অভিজ্ঞতার সঞ্চয়টুকু হাতড়ে খুঁজে ফিরি যখন, তখন ঠিক বুঝতে পারি, সে পথ ঠকায়নি মোটেই। অনন্ত সে পথের সঞ্চয়ে কান্না-ছোঁওয়া ভালবাসার মতো বেঁচে আছে এক নারীকণ্ঠের গান। তিনি অনন্তবালা বৈষ্ণবী।

সেইরকম এক ঘুমজড়ানো ভোরবেলায়, যখন রেলওয়ে স্টেশনে দিলীপ ঘোষের চায়ের দোকানে চায়ের কাপে সামান্য উষ্ণতা খুঁজে বাঁচতে চাইছি আমরা, তখনই কানে এল—

“যশোদে মা তোর কৃষ্ণধন দে গোষ্ঠে নিয়ে যাই।

ও মা, সব রাখালে, তারা গিছে চলে

কেবল বাকি আছে ব্রজের কানাই বলাই 

দে মা গোষ্ঠে যাই।।

হায় গগনে উদিত ভানু 

উঠো রে ভাই নন্দের কানু

বাথানেতে বাধা ধেনু আর তো নিশি নাই।।

কেন মায়ের কোলে,

ও ভাই রলি ঘুমে

কেন ঘুম ভাঙ্গে না ও ভাই কানাই

দে মা গোষ্ঠে যাই।

হায়, গোচরণে গোষ্ঠের পথে

কষ্ট নাই মা গোষ্ঠে যেতে

সব রাখালে স্কন্ধে তুলে নিয়ে যাই গো মা,

ও মা,কানাইর ক্ষুধা হলি পরে, 

আমরা দণ্ডে দণ্ডে মা ননী খাওয়াই

দে মা গোষ্ঠে যাই।।

হায় মণিগণের দ্বারে দ্বারে

ভিক্ষা করি সব রাখালে

অন্ন ভিক্ষা চাই

ও সব মণিগণে, দিলেন ফল আনিয়ে

সে ফল আমরা না খাই কানাইরে খাওয়াই।

দে মা গোষ্ঠে যাই,

যশোদে মা তোর কৃষ্ণধন দে গোষ্ঠে লইয়া যাই।”

পূর্ব-গোষ্ঠের সখ্যরসের গান। বাইরে এসে দেখি অশোকদার (অশোক পোদ্দার) পানের দোকানের সামনে পায়ে ঘুঙুর, হাতে একতারা— এক বৈষ্ণব গেয়ে চলেছেন আপনমনে। রিকশাস্ট্যান্ডে রিকশার মালিক আছে দু-একজন, ভোর-ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী, আমরা কয়েকজন শীতচরা মানুষ ঘিরে দাঁড়িয়ে সেই গান শুনতে শুনতে কোথাও কি হারিয়ে যাচ্ছিলাম!

এই গান প্রথম আমি শুনেছি আমার গানপাগল বাবার কাছে। নিতান্তই ঘরোয়াভাবে। তার পর রেকর্ডে। একদিন কৌতূহলে বাবাকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম, শিল্পীর নাম অনন্তবালা বৈষ্ণবী। তার পর যখন ক্যাসেট প্লেয়ার কেনার সঙ্গতি হয় তখন শুনেছি তাঁর আরও গান। যেমন—

১) “নিমাই, দাঁড়ারে…

দাঁড়ারে দাঁড়ারে নিমাই, দেখিব তোমারে।।”

২) “কালা আমার পাগল বানাইছে রে

ঘরে রই কেমনে।

কালা, কালা বলে আমি গো,

আমি ভাসি নয়ন জলে।।”

৩) “ঘরে বাইরে সুহৃদ না থাকিলে রে

তার মনের দুঃখ না হয় নিবারণ।

তখন না থাকে পিরীত, হয় বিপরীত

মাঝে চলে বিচ্ছেদ দুঃশাসন।।”

এই গানগুলো এখন আর শুনি না। যেমন শুনতে চাই না রবীন্দ্রনাথের গান, বা রাধারমণের গান। অথবা অখণ্ড কোনও অবসরে অনন্ত গোঁসাইয়ের কোনও গান। গানগুলো আমি প্রচণ্ড ভালবাসি বলেই এসব গানের হাহাকারের মহত্ত্বটা বোধহয় সইতে পারি না। আমি তো সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ নই, নিছক শ্রোতা। কিন্তু কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করে হারানো দিন, হারানো মানুষ, হারানো আরও অনেক কিছুর জন্য ভেতরে লালন করা আর্তনাদগুলোকে আগলে রাখতে কষ্ট হয়।

মনে আছে, ১৯৭৭-৭৮ সালে যখন আমরা জ্যাঠামশাইয়ের চাকরিসূত্রে হরিহরপাড়ায় ছিলাম তখন নতুনপাড়া বলে একটি জায়গায় এক গানের অনুষ্ঠানে খুঁজে পেয়েছিলাম অনন্তবালা বৈষ্ণবীর দত্তক পুত্রকে। তিনি বেতাইয়ের মানুষ‌। বগুলা রেলওয়ে স্টেশনে অজানা যে শিল্পীকে এক শীতসকালে আমি এবং কমলদা গান গাইতে দেখি, সেই মানুষটাই ছিলেন অনন্তবালার দত্তক পুত্র, অনেকটা পরে আমি বুঝতে পারি। ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন।

খালেদ চৌধুরীর আঁকা অনন্তবালা বৈষ্ণবীর ছবি

অনন্তবালা সম্পর্কে লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু সবটাই উল্লেখমাত্র। খোঁজখবর করে দেখা যায়, অন্তত দুশোটি গানের রেকর্ড করেছিলেন তিনি মেগাফোন কোম্পানি থেকে। এমন দাবি অনেকেই করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রেকর্ডের সংখ্যা চিহ্নিত করা গেছে আটান্নটি। রেকর্ড করা গানের সংখ্যা একশোর কাছাকাছি। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের প্রথম শ্রেণির শিল্পী। একাধিক চলচ্চিত্রে গেয়েছেন। গেয়েছেন বেশিরভাগ বৈষ্ণবীয় ঘরানার পল্লিগীতি। যেগুলো বেশিরভাগ ভাটিয়ালি সুরে। ইসলামি গান রেকর্ড  করেছেন। ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলার বাউল’ গ্রন্থে অনন্তবালাকে বীরভূমের বাউল বললেও সেটা সত্য নয় বলেই মনে করি। মনে করাটা ভুল নয়, বরং সেটা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে আমাদের কিশোরবেলাকার বন্ধু কল্যাণী ঠাকুরের সাম্প্রতিক একটা লেখা থেকেও। ননীগোপাল সিকদার রচিত একটি ক্ষীণতনু পুস্তিকার সূত্র ধরে মোটামুটি একটা তথ্যনির্ভর জীবনের কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছি আমরা।

এই পুস্তিকার গুরুত্বপূর্ণ লেখা অধ্যাপক মণি মণ্ডলের ‘পল্লীগীতি সম্রাজ্ঞী-অনন্তবালা বৈষ্ণবী’। তিনি লিখেছেন, “জন্ম বাংলা ১৩১০ সালের ১৪ই ফাল্গুন মঙ্গলবার। বাবার নাম তারিণীচন্দ্র গাইন। গ্রাম তুরুকখালি (বর্তমান নাম পূর্ব সাঁচিয়া) জেলা বরিশাল। বাবা মা’র দেওয়া নাম হরসুন্দরী।” মণি মণ্ডলের এই তথ্য সম্পর্কে দ্বিতীয় কোনও মতের অবকাশ নেই। কারণ, অনন্তবালার জীবৎকালে তিনি একাধিকবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন কৃষ্ণনগর রোড স্টেশনের নিকটবর্তী শিল্পীর শেষ আবাসস্থলে। আর সেইসব দেখা করার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যাচ্ছে, অনন্তবালার পৈতৃক পদবি গাইন। ভাটি বাংলার মানুষের মধ্যে ‘গায়েন’ বা ‘গাইন’ পদবির উৎস খুঁজতে গিয়ে পারিবারিক সঙ্গীত ঘরানার সন্ধান মিলেছে। ফলত একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, অনন্তবালার রক্তে ছিল সাঙ্গীতিক উত্তরাধিকার। অনন্তবালা বা হরসুন্দরীর ঠাকুরদা ছিলেন পল্লিগীতির শিল্পী। বাবা তারিণীচন্দ্র গাইন এবং তাঁর তিন পুত্র যোগেশচন্দ্র, উমেশচন্দ্র ও গণেশচন্দ্রের সম্মিলিত কীর্তন গানের দল ছিল। পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িতে ‘হরির লুট’ বা ‘মহোৎসব’-এর আসরে হরসুন্দরী অনন্তবালাও বাপ-ভাইয়ের গানের সঙ্গী হতেন, এমন তথ্য জানিয়েছেন অনন্তবালা নিজেই।

সাত বছর বয়সে ‘গৌরীদান’-এর নিয়ম মেনে হরসুন্দরীর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিধবা হতেও সময় লাগেনি। বাপ-ভাইয়ের আশ্রয়ে হরসুন্দরীর জীবন অভিশপ্ত হয়নি। কিন্তু নিজের ভেতরে ভেতরে গানের দুর্নিবার টান তাঁকে ঘরছাড়া করেছিল। পরবর্তী জীবনে তাঁর গাওয়া একটি গানের কথা যেন নিয়তির মতো টেনেছে তাঁকে— “কালা আমায় ঘর ছাড়া কইরাছে রে, ঘরে রই কেমনে?” 

না, ঘরের চার দেওয়ালের বন্ধনে অনন্তবালা আটকে থাকতে পারেননি বরং গানের টানেই পথ হারিয়েছেন, পথ খুঁজে নিয়েছেন। এমনই পথের ঠিকানা শহর কলকাতার কাছাকাছি হাওড়ার সালকিয়ায় গড়ে উঠল প্রথম, ৭৪ নম্বর হালদারপুকুর লেন, হরিদাস বৈরাগীর বাড়িতে। ভিক্ষা হয়ে উঠল জীবিকা। গান গেয়ে ভিক্ষা করতে করতেই শহর কলকাতায় ইসমাইল নামের এক গানপাগল তরুণ তাঁকে নিয়ে যায় শালিমার কোম্পানি আয়োজিত এক গানের আসরে, পারিশ্রমিক দশ টাকা। ওই আসরে ছিলেন গুরুধারার গায়ক মঙ্গল ফকির। অনন্তবালার গান শুনে মুগ্ধ ফকির তাঁকে শিষ্যা করে নিলেন। আর হিজ মাস্টার কোম্পানির বড়সাহেবের ড্রাইভার সোমেদ সাহেবের সহায়তায় মেগাফোন কোম্পানির মালিক জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রথম গান রেকর্ড করলেন অনন্তবালা বৈষ্ণবী নামের। সাল ১৯৩৭, অনন্তবালার প্রথম রেকর্ড বের হয় (J.N.G.483)। গানটির কথা ছিল—

“আমার প্রাণ কান্দে ভাইরে সদাই মাইয়া বলে

হল মাইয়াতে উৎপত্তি জগত

মাইয়া আমার হৃদিতলে

মাইয়ার গুণের কী দেই সীমা

দ্বাপর যুগে কৃষ্ণলীলা

করেন সেই কালা

যেদিন গিরি ধারণ করলেন কৃষ্ণ

সেদিন শক্তিরূপে সঞ্চারিলে।”

আঙুরবালা, আশ্চর্যময়ী দেবী, ইন্দুবালা, ইন্দুলেখা, কমলা ঝরিয়া প্রচলিত ধারণা ভেঙে রেকর্ডের গানে এসেছিলেন। তখন ভাবা হত গানবাজনা করে খারাপ মেয়েরাই, ভদ্রজনের তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষায় ‘মেয়েছেলে’। সাধারণ এই ধারণা ভাঙার কাজ অনন্তবালারা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামি গানের রেকর্ড করে আশ্চর্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন অনন্তবালা। ইসলামি সমাজে গান হল ‘শয়তানের বাঁশি’। হিন্দু বৈষ্ণবী নারীকণ্ঠে সেই গান একটা তোলপাড় শুরু করে দেয়‌। জানা গেছে, অনন্তবালার প্রথম রেকর্ড করা ইসলামি গান ছিল “হলো দো’জোহান উজালা”। তবে জনপ্রিয় ইসলামি গান ছিল “মুর্শিদ প্রেমের পাকা রঙ্গে” আর “ধনি, প্রেম করতে পারবি কি তোরা/আমার নূর নবী জগতের পতি/প্রেমেতে সে হল্ করা।” 

ইসলামি সঙ্গীত অনন্তবালাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিল, আবার অনভিপ্রেত এক মামলার মুখোমুখি তাঁকে কুষ্টিয়া আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়েও গিয়েছিল। দুঃখজনক ঘটনা হল, এই মামলার পিছনে ছিলেন পল্লিকবি জসীমউদ্দীন। শচীন দেববর্মণ এবং নজরুল ইসলাম অনন্তবালার পাশে ছিলেন, কিন্তু এ সময় অনন্তবালা অনেকটাই মানসিক বিপর্যয়ে ভেঙে পড়েন।

প্রসঙ্গত একটা কথা বলা দরকার। তখনও পর্যন্ত রেকর্ডের গানে পল্লিগীতি কথাটি চালু হয়নি। বিভিন্ন আঞ্চলিক নামই ব্যবহার করা হত। যদিও এই ভাটিয়ালি সুরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বিভিন্ন উপবিভাগের নাম পাওয়া যায়। যেমন পল্লিগীতি, ভাটিয়ালি, ইসলামি, গ্রাম্যগীতি, গ্রাম্যসঙ্গীত ও কীর্তন। যদিও পল্লিগীতি, গ্রাম্যগীতি বা গ্রাম্যসঙ্গীত হিসেবে রেকর্ড করা সমস্ত গানই বিষয়ে বৈষ্ণবীয়। কৃষ্ণ-রাধা কিংবা চৈতন্যদেব সেখানে প্রধান। অনন্তবালার গান ভাটিয়ালি। ভাটি বাংলাদেশের গানে তিনি তখন সম্রাজ্ঞী। অন্যদিকে ভাওয়াইয়া গানে আব্বাসউদ্দিনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কিন্তু আব্বাসউদ্দিনের যে প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষা ছিল, নিরক্ষর অনন্তবালার তা ছিল না। কলকাতায় এসে পড়াটা শিখলেও লিখতে জানতেন না। কোনও বিশেষ গুরুর কাছে নাড়া বেঁধে গান শেখা তাঁর হয়নি। সেদিক থেকে তিনি অনেকাংশেই স্বশিক্ষিত বলা যায়। তবে তাঁকে সাহায্য করতেন পরেশ দেব, শচীন দেববর্মণ এবং কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল ইসলামের সুরে অনন্তবালা দুটি গান রেকর্ড করেন। যদিও সেই রেকর্ডের হদিশ আমরা এখনও পাইনি।

কাজি নজরুল ইসলামের সুরেও গান গেয়েছেন অনন্তবালা

দেশভাগ ভাটিয়ালি গানেও ভাটার টান নিয়ে আসে। কেননা, ভাটিয়ালি গানের জনপ্রিয়তা পূর্ববঙ্গেই সমধিক। ফলে ক্রেতাদের একটা বড় অংশ হাতছাড়া হয়ে যায়। অনন্তবালার জীবনেও দুর্বিষহ অবস্থা নেমে আসে। যদিও তিনি নিজেও এজন্য অনেকটা দায়ী ছিলেন বলে মনে হয়। বাড়ি তৈরি করেছিলেন, কিন্তু দান করে দেন। হিসেবের খাতায় যে মন ছিল না সে কথা বলেছেন বিমান মুখোপাধ্যায় তাঁর সাক্ষাৎকার ‘বিমানে বিমানে আলোকের গানে’-তে। অনন্তবালার সঙ্গে দেখা করেছিলেন রণজিৎ সিংহ। ‘মাটির সুরের খোঁজে’ গ্রন্থে সেই স্মৃতিচারণ আছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ জীবনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। 

কৃষ্ণনগর রোড স্টেশনের কাছে ছিল অনন্তবালার শেষ আশ্রয়, সেখানে বানিয়েছিলেন কৃষ্ণ মন্দির। তার পর একসময় চলে যান নদিয়ার তেহট্ট থানার বেতাই গ্রামে। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত সংগ্রাহক সৌম্য চক্রবর্তীর বয়ান গ্রহণযোগ্য। তিনি জানাচ্ছেন খালেদ চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কাছ থেকে তিনি প্রথম অনন্তবালার নাম শোনেন। তাঁদের নির্দেশমতো নদিয়ার বেতাইতে উপস্থিত হয়ে এক উদ্বাস্তু কলোনিতে অনন্তবালাকে খুঁজে পান, কথা বলেন এবং তাঁর গান রেকর্ড করেন। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে সৌম্য চক্রবর্তীর বয়ান-সহ অনন্তবালার সম্ভবত শেষ রেকর্ড করা গানটি ধরা আছে। এর পর কলকাতা শহরের এক বিশাল সঙ্গীত-আসরেও অনন্তবালার গান শুনেছেন সৌম্য চক্রবর্তী। কিন্তু তার পর হারিয়ে গেলেন অনন্তবালা। বাংলা সঙ্গীতের জগতে চল্লিশ-পঞ্চাশে মহিলা শিল্পীদের পরিচয় ছিল দেবী অথবা দাসী। কাননবালা দেবী, আঙুরবালা দাসী, বেদানাবালা দাসী। এই দেবী-দাসীদের জগতে একমাত্র বৈষ্ণবী অনন্তবালা বৈষ্ণবের নিরাসক্তি সম্বল করেই হারিয়ে গেছেন। এমনকি তাঁর তিরোধানের তারিখটিও নির্দিষ্ট নয়। শুধু জানা যাচ্ছে বাংলা ১৩৮৬ সালের আষাঢ় মাসে তিনি মারা যান।

 

 

 

 

মতামত জানান

Your email address will not be published.