বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

জাকারান্ডা ও আর এক মহেশ্বর

ধর্মযুদ্ধে জয়ী হলেও পাণ্ডবদের পাপের ভার তো আর কৃষ্ণ নেবেন না। ভ্রাতৃহত্যা, গুরুহত্যা, ব্রাহ্মণহত্যার পাপ ঘাড়ে নিয়ে স্বর্গের পথ বন্ধ। কৃষ্ণের কথায় স্বর্গের ছাড়পত্র জোগাড় করতে তাঁরা চললেন শিবের কাছে। সবার ওপর শিব সত্য।

শর্ব্বা ঘোষ নাথ

 

দেবপ্রয়াগ ছাড়াতেই একটা-দুটো করে চোখে পড়ছিল জাকারান্ডাগুলমোহরের মতো ঝিরঝিরে পাতা। ড্রাইভার বললেন, এদিকে এ ফুলের নাম নীল মোহর। উখিমঠের আগে থেকেই তার আপ্যায়নের বাড়াবাড়ি। জ্যৈষ্ঠের ফ্যাকাশে আকাশের নীচে তার ঘন নীল শামিয়ানা। গাড়ি চলেছে নীল জাজিমের ওপর দিয়ে। যেন এখনই বিউগল বেজে উঠবে। প্যারাট্রুপারের বদলে জাকারান্ডা ক্যানপি থেকে ঝরে পড়বে রাশি রাশি ফুল। এ উৎসব সাজ কি শুধুই উচ্ছ্বাস? না কি এই নীল রোমাঞ্চের ভেতরে রয়েছে কোনও গভীর রহস্য?

হরিদ্বার থেকে এক গাড়িতেই উখিমঠে এসে থামলাম। রবীন্দ্রজিও কাজ সেরে এখান থেকেই উঠলেন। পূর্ব পরিচয় যেটুকু দূরাভাষেইসদালাপী শিক্ষকতাঁর কাছে পেশ করলাম নীল রহস্য জানার আর্জি। হেসে বললেন, হিমালয়ের পথ সবসময়েই রহস্যে মোড়া। তবে এই সময়টা যেন নীল মোহরের খামে সিলমোহর করা এক অমূল্য সম্পদমোহরের মতোই যাকে আগলে রাখতে হয়শুধু গন্ধে বা গুণে নয়। এ ফুল ফুটলেই সবাই বোঝে এসে গেছে ডোলি-যাত্রার সময়। এক কিলোমিটার নীচে ওঙ্কারেশ্বরের মন্দির থেকে মধ্যমহেশ্বর তাঁর শীতকালীন গদ্দি ছেড়ে রওনা হবেন ওপরে। এ সময়ে প্রকৃতি, মানুষ যতটাই দিলদার ততটাই নাজুক। 

জাকারাণ্ডা

নীলকণ্ঠর বিদায়বেলায় নীল মোহরের রং মেলান্তি, এই তো? ইসে বিদাই মত কহেনা জি। গলা নরম করে বললেন বর্ষীয়ান মানুষটিবরং বলুন অপেক্ষা। কেদারনাথ আগেই রওনা হয়েছেন অক্ষয় তৃতীয়ায়। মধ্যমহেশ্বরের ভোগমূর্তি উৎসব-ডোলি চড়ে এ পথেই আসবেন। মানসুনা, উনিয়ানা হয়ে  নীল নরম ছায়ায়। নীল মোহরের গালচে মাড়িয়ে। পৌঁছবে রাঁসি।গাড়ি থামল রাঁসিতেই। মোটর-পথের শেষ। দূরে সবুজ পাহাড়ের সিঁথির ওপর রূপোর মুকুটের মতো সাদা চুড়ো। হইহই করে ছুটে এলেন সবাই। যেন কতকালের প্রতীক্ষা আমাদের জন্য। পরিচয় হল অশোক ভাট, অনীশ ভাটের সঙ্গে। পাহাড়ি গ্রামের অনাড়ম্বর আত্মীয়তায় পাষাণেরও মন গলবেরাশি রাশি হাসিমুখের জয়। চেঁচিয়ে উঠলেন সবাই, জয় রাঁসমাঈ, জয় মদমহেশ্বর।

মদমহেশ্বর! কেন? প্রশ্নের উত্তর দিতে এগিয়ে এলেন এক বাঙালি। বললেন, বন্ধু হোরাসিও, এত তাড়া কীসের? এলেন-দেখলেন-জয় করলেন বড়ই কাব্যিক। তার চেয়ে উপন্যাসের গড়ানে চলুন। দু’হাত উপচে পড়বে। আলাপ জমে গেল হরিদ্বারের দীপ্ত মিত্রর সঙ্গে। চরিত্র গুণে মিত্রতা হতেও দেরি হল না। বার পঁচিশেক এ পথে পাড়ি। চলন্ত মদমহেশ্বর বলে লোকে। 

নদী সঙ্গম

গাড়ির রাস্তার ওপর আমাদের থাকার আস্তানা অশোক ভাটের ডেরায়। চা-পকোড়ার বিরতির পর গ্রাম দেখাতে নিয়ে চললেন দীনেশ পাঁওয়ার, দীপ্ত মিত্র। শেষ বিকেলে নন্দীকুণ্ড আর কাঁচনি পাহাড়ের সাদা মাথায় কমলার ছোপ। ধাপ-চাষ, ঘরবাড়ি পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল ধরে। অন্যদিকের ঢাল ধরে হুই নীচে ফিতের মতো মধ্যমহেশ্বর গঙ্গা। ডাক নাম মধুগঙ্গা।সিঁড়ি উঠেছে গ্রামের অন্দরে। উঠোন পেরিয়ে, ছাগল খেদিয়ে, গোবর ডিঙিয়ে, মেয়ে-বউদের জটলা পেরিয়ে রাকেশ্বরী মন্দির। তার চাতালটা বিকেলের খেলার মাঠ। কচি-সংসদের দখলে। ফাটা গালে, রুক্ষ চুলে তাদের অভাবের লালিত্য, অযত্নের আদর। ঘণ্টা ঝোলানো ফটকের পর চাতাল টপকে গর্ভগৃহ আর মণ্ডপ নিয়ে মন্দির। তার কাঁধ থেকে উঁকি দিচ্ছে পাহাড়চুড়ো। নাইট ডিউটির অপেক্ষায় গোল চাঁদআরতি হতে ঢের দেরি। 

ওপরে আঙুল তাক করে দেখালেন দীনেশ। গ্রামের চৌকাঠে বনপথ করে নিয়ে ডানপিটেরা যায় ফুলে ছাওয়া মান্দানি উপত্যকায়। ইয়নবুক, বিশালি, মহাপন্থ কল পেরিয়ে পঞ্চকেদারের অন্যতম কেদারনাথে। মান্দানির পক্ষ নিয়ে দীপ্তবাবু একাই একশো। ফুলের বৈচিত্র্যে সে নাকি নন্দনকাননের জুড়ওয়া। প্রবাসী বলে দীপ্তবাবু বাংলার ঘাটতি পোষান হিন্দিতে। দীনেশও বেশ কয়েকবার খানিকটা গেছেন। আয়েশি ট্রেকারদের পক্ষে অসম্ভব কঠিন পথ। খানিক ভয়েই গাইড হতে দেয়নি দীনেশের পরিবার। মরসুমি ঝুম-চাষ, ঘি-দুধ, উলের কারবারে চালিয়ে নেন কোনওরকমে। পথ কি সত্যিই ভয়ংকর? না কি যত ভয় পথিকের মনে?

যা কিছু সব ভেতরেই থাকে মশাই, বললেন দীপ্তবাবু। পঞ্চাশ পেরোনো পাহাড়িয়া মানুষটি গামছার ব্যবসায় সম্বল খুইয়েছেন। পেশা নেই। পেষাই নেই। নেশা-ভাং করেন না। তবে ছবি তোলার বাতিকবললাম, চলে কী করে? বললেন, ‘বাবাকা বুলাওয়া’ এলে তিনিই সামলান। আর সামলায় এরা। ভাট, পাঁওয়ার, রাওয়াত মিলে গোটা গ্রামমনের মানুষ সব। তার ওপর আছে চোখের ডাক্তার পুবালি। দীপ্তবাবুর মধ্যে বিশ্বরূপ দর্শন করে তাঁর আর আইবুড়ো নাম খণ্ডানো হয়নিনির্ভেজাল বন্ধুত্বে জুটেছে এই খামখেয়ালি, পাহাড় ঘুরুনের ইহজীবনের ভারদীনেশকেই সেলুকাস ঠাওরে আলেকজান্ডারের কায়দায় বললাম, সত্যি, কী বিচিত্র এ পথ! কী বিচিত্র মানুষ!

চারদিকে উৎসবের খোশমেজাজ। কলতলায়, পাথরের রোয়াকে, বাড়ির উঠোনে জমেছে গল্প। ঘাসের বোঝায় পিঠ নুইয়ে ফিরছে ঘসেরি বেগমরা। ফোসকা জ্বলা পিঠে কারও জ্বালানির কাঠ। তাদের রংচটা পোশাক, রামধনু হাসি।

ঘসেরি বেগমেরা

আরতির ঘণ্টা বাজল। কষ্টিপাথরের মাতৃমূর্তি। রামের পুজোয় তিনি রামেশ্বরীরাকেশ বা চাঁদের পুজো পেয়ে তিনি রাকেশ্বরী। গ্রামের নামও তাই রাসু থেকে রাঁসি। সবার তিনি রাঁসমাঈ। সুখ-দুখে আপনজন। বললেন, প্রধান পুরোহিত ঈশ্বরীপ্রসাদ ভট্টএক গ্রীষ্মে গাড়োয়ালি সুন্দরীদের অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে জোছনার আলো ফেলেই বিপদে পড়েন রাকাপতিমেয়েদের নালিশে জোটে অত্রিমুনির অভিশাপ। এইখানেই তপস্যায় কলঙ্ক ঘুচিয়ে তাঁর শাপমুক্ত হওয়ার পৌরাণিক গল্প শুনলাম পুরোহিতের  মুখে। পঞ্চপ্রদীপে, কাঁসর-ঘণ্টা-শাঁখের বাদ্যিতে আরতি হল গর্ভগৃহে। তামিল, মারাঠি, গুজরাটি, বাঙালি নিয়ে সেখানে একটুকরো দেশ পুজোর প্রসাদ পেল। 

মধ্যমহেশ্বর আসছেনতাই মন্দির সাফাইয়ে লাগলেন কয়েকজন। ট্রেকারদের কেউ কেউ ছুটলেন রান্নাঘরে। দীপ্তবাবুর নেতৃত্বে আন্ডা-কারির ফরমায়েশ করতে। মধ্যমহেশ্বর এলে কাল আর আমিষ জুটবে না। 

গুছিয়ে বসলেন ঈশ্বরীপ্রসাদ। বললেন, এই ভট্টরাই মন্দিরে নিত্যপুজো সামলাচ্ছেন। উনি জনানন্দ ভট্টর ছেলে শুনে বেশ উত্তেজিত হলাম। হিমালয়প্রেমী স্বর্গীয় উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যমহেশ্বর যাত্রায় যাঁর কথা জেনেছি। এ নাম শুনে ঈশ্বরীপ্রসাদ কপালে হাত ঠেকালেন। বললেন, ওঁর লেখা চিঠি আর সই এখনও যত্নে আছেআছে অনেকের সই করা একটা খাতা। তাঁদের বেশিরভাগই বাঙালি। তাছাড়া পথের জন্য কাঙালপনা কারই বা এমন! প্রচ্ছন্ন গর্বে মুহূর্তের উদারতায় বলে বসলাম, আজ রাত কা খানা ম্যায় পাকাউঙ্গিরসুইঘরে খবর দাও।

তবে উমাপ্রসাদের দেখা রাসু গ্রামের সঙ্গে এখনকার রাঁসির মিল খুঁজতে যাওয়া বোকামি। বললাম,  মন্দির ঘিরেই যখন একাল-সেকাল, মন্দিরেরই গল্প বরং শুনি। জাঁকিয়ে বসলেন পুরুতমশাই। বললেন, তখন ভোগের ব্যাবস্থা হত প্রতি ঘর থেকে এক দিন এক সের করে চাল নিয়ে। তার পর পঞ্চায়েত, মন্দির কমিটি সব হল। এখন রাঁসমাঈকে ঘিরেই বছরে দু’বার মেলা। বৈশাখে বৈশাখী। আশ্বিনে উঁচকিনি। দ্বিতীয়টার জাঁক বেশি। ঢল নামে আশপাশের গ্রাম থেকে। শ্রাবণ-ভাদ্রে চলে পাণ্ডবগাথার আসর। কথক শিবরাজ সিং পাঁওয়ারের বয়স হলেও বেড়ে দম। তাঁর তালিম জগত সিং ভাট আর সাহস সিং পাঁওয়ারের কাছে। তাঁরা নেই। চলছে পরম্পরা। শিবরাজজির শিষ্যরাই এখন মঞ্চ কাঁপান। মহাভারতের পালায় হাসান-কাঁদান। 

শিবরাজজি কখন এসে বসেছেনবললেন, ছোটদের সময় নেই এসবের জন্য। তবে ঠাকুমার গল্পের ঝুলি ওই রামায়ণ-মহাভারত। তাই শুনেই বড় হয় সব। মন ছুঁয়ে রক্তে মেশে মহাকাব্য। নিজেদের পাণ্ডবদের বংশধর ভাবেন অনেকেই। মুখে মুখে পাল্টায় গল্প। বেচারা পাণ্ডুর দ্বিতীয় বিয়ের শিকে ছেঁড়েনি এ গল্পে। নেই মাদ্রি। রাজমাতা কুন্তী বুড়ি দেশওয়ালি। মহাভারতের মধ্যমহেশ্বর সংস্করণ! 

মধ্যমহেশ্বরের গল্পের বীজ মহাভারতেই। বললেন, শিবরাজজিকথকের বলার ধরনটিও বেশ। শ্রোতা পেয়ে উৎসাহ সপ্তমে। বললেন, ধর্মযুদ্ধে জয়ী হলেও পাণ্ডবদের পাপের ভার তো আর কৃষ্ণ নেবেন না। ভ্রাতৃহত্যা, গুরুহত্যা, ব্রাহ্মণহত্যার পাপ ঘাড়ে নিয়ে স্বর্গের পথ বন্ধ। কৃষ্ণের কথায় স্বর্গের ছাড়পত্র জোগাড় করতে তাঁরা চললেন শিবের কাছে। সবার ওপর শিব সত্য। কুরুক্ষেত্রের ঘটনায় তাঁদের ওপর রেগে থাকায় শিব দেখা দিতে নারাজ। লুকোলেন ষাঁড় সেজে। গুপ্তকাশীতে। তেজ দেখে সন্দেহ হল ভীমের। পেছন থেকে যেই না জাপটে ধরা অমনি তিনি ছটকে ছয় হলেন। ছড়িয়ে গেলেন হিমালয়ের ছয় দুর্গম স্থানে। মন গললে জানালেন, এই ছয় জায়গায় ধ্যান-জপেই মুঠোয় মিলবে মোক্ষ।

মদমহেশ্বর উপত্যকা

পাণ্ডবরা লেগে পড়লেন। মন্দিরও গড়লেন। কল্পেশ্বরে জটা, রুদ্রনাথে মুখ, তুঙ্গনাথে বাহু, মধ্যমহেশ্বরে নাভি আর কেদারনাথে কুঁজ। কেদারখণ্ডের পঞ্চকেদার। আর মাথা ফুঁড়ে উঠলেন নেপালের পশুপতিনাথে। দেহের মধ্যভাগ নাভি বলে আবার কেদার-বদ্রীর মাঝে বলেও নাকি মধ্যমহেশ্বর। সবাই কপালে হাত ঠেকালেন। যস্মিন দেশে যদাচার। এ কথা বলতেও সাহস হল না যে এসব আর্য স্থাপত্য কাদের তৈরি সঠিক জানা না গেলেও, ইতিহাস কিন্তু পাণ্ডবদের কথা কোথাও  বলে না। 

রবীন্দ্রজি আসায় গাড়োয়ালি হিন্দির হিন্দি অনুবাদে কিছুটা সুবিধে হল। সবার প্রিয় মাস্টারজি। গল্পের মোড় ঘুরল পেছনে। তখন মধ্যমহেশ্বরের হাঁটা শুরু হত উখিমঠ থেকেই। জঙ্গলে ওত পেতে থাকত বিপদ। তীর্থপথে অসুস্থ হলে মরেই বাঁচতে হতমধুগঙ্গায় ছুড়ে ফেলে সৎকার একরকম স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়া। কুণ্ডে এ নদী মিশেছে স্বর্গের আর এক নদী কেদারনাথ থেকে আসা মন্দাকিনীতে। স্বয়ং উমাপ্রসাদ যাত্রা শুরু করেছিলেন উখিমঠ থেকেই। তাঁর যাত্রাপথের সেই ভয়ংকর সুন্দর জঙ্গল আর নেই।  

পথও কমেছে, বললেন ঈশ্বরীপ্রসাদজি। উখিমঠের পর আগে মানসুনা, পরে উনিয়ানা থেকে শুরু হত হাঁটা। মোটর-পথ এখন রাঁসির পরের গ্রাম গৌণ্ডারের কাছে। এই নিয়ে দুই গ্রামের সম্পর্ক ঘোলাটে। স্বচ্ছন্দে ছ’কিলোমিটার এগিয়ে যেতে কে না চায়রাঁসির গুরুত্ব কিছুটা তো কমবে। এখন মানুষের তাড়া বেশি। হতাশ সুরে বললেন শিবরাজজি। 

এ পথে রাঁসির টান বাঁশির সুরের মতো। মানুষ আসবেই। বললেন, রবীন্দ্রজি। সত্যিএত সরল সুন্দর গ্রামে আবার ফিরতে ইচ্ছে করে। পিছুটান এক মায়া-রোগ। হঠাৎ এসে বললেন দীপ্তবাবু। সীমানা পেরোলেই গলা বুজে আসে। ঝাপসা হয় চোখ। মদমহেশ্বরজি, ওঙ্কারেশ্বর ছাড়লে এমনই হয় সবার।

আলো মাখা রাঁসি

ফেরার প্রস্তুতি আগের দিন থেকে। বললেন, রবীন্দ্রজিগর্ভগৃহ ছেড়ে সকালেই মণ্ডপে দর্শন দেন মদমহেশ্বরজি। বৈশাখের নতুন আনাজে ভোগ দিয়ে তবেই সে ফসল ঘরে তোলে গৃহস্থ। মহাভিষেক সেরে শৃঙ্গার করে দেন প্রধান পুরোহিত। কর্ণাটকের মহীশুরের লিঙ্গায়েত ব্রাহ্মণ ছাড়া এ অধিকার নেই কারও। আর্যাবর্তের ভগবানের পুজোর ভার দাক্ষিণাত্যের ব্রাহ্মণের। মিলে যায় আর্য-অনার্য। 

নতুন গমের আটার পুরি, মিষ্টি পকোড়ার শুখা ভোগ মন্দিরেই বানান ভক্তরা। আজ সারাদিন এইসবই চলেছে সেখানে। কাল সকালেই ডোলি-যাত্রা। ডোলির সঙ্গেই মন্দির পরিক্রমা করেন ভক্তরা। যাত্রার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সবাই। যেন বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বাবাপাকদণ্ডী পথ বেয়ে উঠে আসে ডোলি। পাথুরে পথে দণ্ডি কেটে চলে কেউবেশির ভাগই ফিরে যায় উনিয়ানা থেকে। বলে যায়, সাবধানে যেয়ো। আবার এসো। 

আসা-যাওয়ার মাঝে সেতু গড়ে অপেক্ষা। ফিরে আসার টানও হয়তো সেটাই। যে অপেক্ষার প্রান্ত ছুঁয়ে থাকে বিজয়া-আগমনী, ভাটিয়াল-সারি। তারই দু’প্রান্তে ওঙ্কারেশ্বর-মধ্যমহেশ্বর। 

দীপ্তবাবু তাড়া দিলেনসবাইকে নমস্কার জানিয়ে মুহূর্তের দুর্বলতায় ঘটে যাওয়া অঘটন সামলাতে  চললাম অশোক ভাটের রান্নাঘরে। বাঙালি রাঁধবে শুনে সব বাঙালির এক রা। সবাই আজ এখানে খাবেন। অশোক আর তাঁর স্ত্রীও হাত লাগালেন। একসঙ্গে খাওয়া হল। 

বাইরে এসে দেখি চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে রাঁসি। নন্দীকুণ্ডের চুড়োয় যেন গলা মোম। শব্দ বলতে শুধু রাত-পোকার ডাক আর মধুগঙ্গার বয়ে যাওয়া। 

সকাল এখানে সাতসকালেই কেজো নেশায় ব্যস্তশালিক, চড়াই আর মরচে বাদামি রঙের পাখি ছোট পেঙ্গা (Streaked Laughing thrush) দোকানের চাতালে মুড়ি খাচ্ছে। দলে পাখি চেনানোর ট্রেকার থাকায় সুবিধে। রাতে রান্নার তারিফ করে এ দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন। ফুলও চেনেন হরেক। জয় রাঁসমাঈ, জয় মদমহেশ্বর, বলে হাঁটা শুরু হল। সঙ্গী তল্পিবাহক অনীশ। 

মধুগঙ্গার উজানে পথ উতরাই। বেশ খানিকটা পিচরাস্তা। মোটর-পথের কাজ চলছে। শিকারের খোঁজে চক্কর দিচ্ছে শিকারি পাখি। গর্ত থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখছে গুঁফো ইঁদুর। বাঁক বদলের সময় ফিরে দেখলাম। রঙিন বাড়ি, ধাপ-চাষ, মন্দিরের চুড়ো, আকাশছোঁয়া গাছ নিয়ে আলোমাখা রাঁসি। পথিককে শেকড় গাড়তে নেই, বলে হাসলেন দীপ্তবাবু। এতটুকু সঙ্গে এলেন। আজ রাঁসিতেই থাকবেন। ডোলির সঙ্গে আসবেন। এগিয়ে চললাম গৌণ্ডারের দিকে।

রোদকে টেক্কা দিতে এগিয়ে এল বন। গাছের ছায়ায়, নদীর হাওয়ায় কষ্টের কেষ্টপ্রাপ্তিনিডল পাইনের তলা বিছিয়ে পাইন কোন। আকাশছোঁয়া গুঁড়িগুলোর গায়ের ফাটলগুলো যেন জ্যামিতিক গ্রাফিটিসবুজ ফালা করে নামছে ঝরনা। তার দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় কে যেন রিপ্লে বোতাম টিপে হারিয়ে ফেলেছে রিমোট। মধুগঙ্গাকে দেখা না গেলেও শোনা যাচ্ছে। পাওডার পাফের মতো গোলাপি সুড়সুড়ি ফুলে প্রজাপতিদের দুর্বার মধু লুঠ। সিংহের দাঁতের মতো রোঁয়াওলা ড্যান্ডেলায়ানদের পাশ কাটিয়ে মধুখোর ভোমরাগুলো গিয়ে বসছে বুনো গোলাপ, তুলতুলে ঘাসফুলের ওপর। একটা ড্যান্ডেলায়ানে চোখ বুজে ফুঁ দিল অনীশ। শুঁয়োর মতো উড়ে গেল কয়েকটা রোঁয়া। বলল, কুদরত সে কুছ মাঙ্গনা হ্যায় তো অ্যায়সে মাঙ্গো জি।    

হঠাৎ কাঁটাঝোপের ভেতরণ কী যেন সরসর করে উঠল। রঙ্গিলা গিরগিটি! সুলেখা নীলের বোতলে শরীরের অর্ধেকটা ছুপিয়েছে সে। ক্ষতি করে না অথচ পোকামাকড় খায় বলে আফ্রিকায় এই ‘রক আগামা’ বাড়িতে পোষার চল আছে বলে শুনেছি। পথের ধারে নানা বুনো ফুল। জংলি স্ট্রবেরি খেতে বেশ টক-মিষ্টি। বনের অন্দরমহলে প্রকৃতির নাট্যমঞ্চ কাঁপায় প্রচারবিমুখ এইসব রথী-মহারথীরা!

পথের ধারে নানা বুনো ফুল

মধুগঙ্গার দেখা পেলাম গৌণ্ডারে। তার পাড়েই মন্দির। এখানেই রাত কাটাবেন মদমহেশ্বরআমাদের বিরতি। কয়েকটা সিঁড়ি উঠে রমেশজির বাড়ির দাওয়ায় জিরিয়ে নিলাম। পাখি দিদিমণি দেখালেন তারে বসে থাকা সাদা-কালো ছোট পাখিটা, গ্রে বুশ চ্যাট। গরম গরম রুটি-তরকারি খেয়ে আবার হাঁটা শুরু। আকাশ ময়লা। যেকোনও সময় বৃষ্টি নামবে। শুরু হল চড়াই। 

১৯৩৪। বদরীনাথ থেকে তুষারপথে কেদারনাথ আসার ইচ্ছে নিয়ে শতপন্থ হিমবাহ পেরিয়ে এই উপত্যকায় নামেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী এরিক শিপটন ও বিল টিলম্যান। এত সবুজে তাঁরা সম্মোহিত।  পথের খ্যাতিও তাই গ্রিন ট্রেক বলে। এক বিদেশিনী নামছিলেন। বললেন, আমাদের আল্পস আছে কিন্তু হিমালয় অতুলনীয়।

খানিক এগিয়ে নদী সঙ্গমের ওপর সেতু। অনীশ বলল, চৌখাম্বা থেকে মার্কণ্ডেয় গঙ্গা মিশেছে নন্দীকুণ্ড থেকে আসা মধ্যমহেশ্বর গঙ্গায়। বয়ে গেছে মধুগঙ্গা নাম নিয়ে। এক সন্তানহীন রাজার পুত্র লাভের গল্পে এ সঙ্গম এক মহাতীর্থ। 

কয়েক ঘর নিয়ে ছোটি বানতলি। এখানেই দ্বিতীয়বার তুলা সিংয়ের সঙ্গে দেখা হয় উমাপ্রসাদেরতুলা সিং তখন সাধনপথের ঠিকানা পাওয়া এক অন্য মানুষ। বনতল বলে নাম রাখেন বানতলি। 

তাক লাগা চড়াই চড়ে যেখানে দমছুট তারই নাম ‘বাঙ্গাল কা লড়াই’এ পথে ‘শের বাঙালি’-র  সেরা বাঙালি উমাপ্রসাদের সম্মানেই এ নাম। 

বিকেলের আগেই পৌঁছে গেলাম আপার বানতলি। বলবীর পাঁওয়ারের ন্যাড়া ছাদে এসে দাঁড়ালাম। বুড়ো আঙুলের নখে চাপ পড়ে রক্ত জমাট। তেমনই ব্যথা। আলুর বস্তা পিঠ থেকে নামিয়ে তড়িঘড়ি ঠান্ডা-গরম জলে পায়ের শুশ্রূষা করলেন বলবীরের স্ত্রী। দুপুরে রান্না করে সবাইকে খাইয়ে আলু নিয়ে ফিরলেন রাঁসি থেকে। তাও বিকেলের মধ্যেই। যে পথটুকু আসতে আমাদের প্রাণান্তকর হাল। সিলভার ওকের পাতায় তখন ঝিকমিক আলো। একটাই ডালে বারবার এসে বসছে পাকা পাতিলেবুর মতো ফুটফুটে হলুদ পাখি, ফুটফুটি

হলুদ পাখি ফুটফুটি

সন্ধে হতেই যেন জঙ্গলটা ছাদে এসে দাঁড়াল। কেদারনাথ অভয়ারণ্যের বাফার জোন হলেও এটা আসলে বন্যদেরই ডেরা। দখল নিয়েছি আমরা। যেকোনও সময় স্বর্গীয় সুগন্ধ ছড়িয়ে এসে দাঁড়াতে পারে একটা কস্তুরী হরিণ। তার পিছু নিয়ে মৃত্যুর মতো ঘাতক চিতাবাঘ। জানলা খুলে তার হাই তোলা দেখাটা স্বপ্নই থেকে গেল। বদলে ঢুকে পড়ল এক খাবলা অন্ধকার। যা সইয়ে নিলে চেনা যায় মুখ। সে মুখ কি বলবীরের বউয়ের? স্নেহের মতো সরল। অতিথিকে না খাইয়ে খায় না যে। সে তো ছিল না তখন। তবে কার টানে এখানেই একটা আস্ত ভিটে গড়েছিলেন উমাপ্রসাদ? 

বৃষ্টি নামল। আলো ছুঁল সবচেয়ে উঁচু গাছটার মাথা। ঝকঝকে আকাশ। অনীশের পিছু নিয়ে চললাম। এইবার নাক-লাগা চড়াই। খাটারা খালের আগেই ফের দেখা হল নীল মোহরের সঙ্গে। অনীশ বলল, অনেক সবুরে এ গাছে ফুল আসে। 

এক বাঁকে মাউন্ট মান্দানি ভ্যানিশ হলে অন্য শৃঙ্গরা কাছে এল। ক্লান্ত পা টেনে, ফুসফুসে দম দিয়ে, নানুতে চা খেয়ে, মইখাম্বা পার হলাম। অনীশ বলল, মইখাম্বার খাঁটি ঘিয়ের নামডাক আছে। দেখলাম একপাল ধেড়ে হনুমান এদিক-সেদিক ঘুরছে। শেষ চট্টি কুন। ছোট্ট একচিলতে ঘরের নাম প্রিন্স হোটেল। উচ্চতার কারণে দু’মিনিটের কিছু বেশি সময় লাগল ম্যাগি বানাতে। বেঞ্চে বসে কল্কেতে টান দিচ্ছেন এক জটাধারী বৃদ্ধঅনীশ বলল, ওঁর আসল নাম জানি না। সবাই বলে মহেশ্বরজি। সংসার ছেড়েছেন সাধনের টানে। সাধক! দেখে মনে হল না। অবশ্য খোলসেই কি সবাই বোঝে কোন ঝিনুকে মুক্ত আছে? যদি না সে জাতের ডুবুরি হয়। 

ওঁর পাশেই বসলাম, একটু তফাতেঘোড়া থেকে কোলে চড়ে নামলেন এক গোলগাল লোক। অসাড় কোমরে হালকা দোল খাইয়ে সাড় ফেরাচ্ছেন। ডান্ডি চড়ে উঠে আসছেন এক সুন্দরী তরুণী। চওড়া লিপস্টিকের ভেতরে একছিলিম হাসি। চার ডান্ডি বাহকের প্রাণান্তকর দশা। তাদের পায়ের আওয়াজে একটা বড় পাখি ধূসর ডানা মেলে উড়ে গেল ঝোপের ভেতর থেকে। অনীশ বলল, মোনাল থি। মানে, মেয়ে মোনাল! এর আগে রংবাজ পুরুষ পাখিটাকে দেখিয়েছিলেন তুঙ্গনাথের রাওয়াতজি। 

হইচই শুনে দেখি ঘোড়াওয়ালার সঙ্গে মিস্টার গোলগালের ধুন্ধুমার। পিঠের ওপর বসার আসন ফেলে ঘোড়া পালিয়েছে। ঘোড়াওলা খানিকটা গিয়ে তাকে পাননি। হেঁটে উঠতে বলায় যত বিপত্তি। জটাধারী বললেন, ঘোড়া সোজা মদমহেশ্বরে গিয়ে থামবে। তার রোজের গন্তব্য। এদিকে ঘোড়াওয়ালার রুজিতে টান। অনলাইনে বুকিং বলে আগাম টাকা নেওয়া। ঘোড়াগুলোর কান ফুটো করে তাই চিপ লাগানো। মানবিকতা ছাড়া মানুষের আর সব গুণই আছে।

রডোডেনড্রনের স্যাঁতসেঁতে জঙ্গলে পায়ের নীচে পাতার পাহাড়। সব দৃশ্য অদৃশ্য করা একঘেয়ে সবুজ অন্ধকার। মাঝে মাঝে দু-একটা লাল ফুল। এখানে বলে বুরাঁস। ফুল দিয়েই তৈরি হয় ফুসফুসের জন্য উপকারী স্কোয়াশ। সে কারণেই প্রতি বছরই শহিদ হয় বীর বুরাঁসের দল। উখিমঠে স্কোয়াশের একটা বড় দোকান দেখেছেন, বললেন সহযাত্রী কর্নেল সাব।

সাধের ফুসফুসজোড়াকে আউর থোড়া, দম লাগাকে বলতে বলতে চড়ি শেষ চড়াইটুকু। অনীশের চলা অবশ্য ঢের কঠিন। উনিশ বছরের ছেলেটা কলেজে যায় না। কলজের জোরে পিঠে মাল নিয়ে রোজ পাহাড় চড়ে। যাত্রী ওর ভগবান। মদমহেশ্বরের দয়ায় চলে যায়। বললাম, কী চাইলে তখন এক ফুঁয়ে? ছেলেবেলা থেকে শখ, একটা ভায়োলিন। কী সুর বাজাবে? মিটিমিটি হাসে ছেলেটা। চোখে ঝিলিক দেয় একফালি স্বপ্ন। 

হঠাৎ এক সমতলে এসে পড়ি। কয়েক হাত তফাতেই মদমহেশ্বর মন্দির। যাকে দেখেই মনে হল বিশাল গিরিশৃঙ্গের পায়ের কাছে করজোড়ে রাজর্ষি ব্রহ্মকমল। সমুদ্রতল থেকে ১১ হাজার ৪৭৩ ফিট ওপরে। চৌকো বাঁধানো জমির ওপর। বন্ধ দরজা। কেদারক্ষেত্রের অন্য মন্দিরের মতোই গঠনচুড়োয় কলস। একদিকে গাভীমুখ থেকে জলের ধারা। অন্যদিকে পার্বতী ও শিব-পার্বতী মন্দির। পিছনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একই প্রজাতির ছ’টি চিরহরিৎ গাছ। এরা নাকি সস্ত্রীক পঞ্চপাণ্ডব! বললেন, এক নম্বর হোম স্টে-র মালিক, ভরতজি। 

রুপোলি পাখির মতো উড়ে আসছে টহলদার হেলিকপ্টার। নামল এসে অস্থায়ী হেলিপ্যাডে। প্রচুর পুলিশ পাঠিয়েছে উত্তরাখণ্ড সরকার। শোনা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই খুব ধনী দেবতা মদমহেশ্বর। কাল তিনি ফিরছেন। তাই এত সাজো সাজো পাহারা। নেতা-মন্ত্রীরাও আসবেন, বললেন ভরতজি। মনে মনে বলি, অসীম ধন তো আছে তোমার। অনীশকে একটা ভায়োলিন দিয়ো। ও যে সুরে থাকতে চায়। 

বৃদ্ধ মদমহেশ্বর

চোখে-মুখে জল দিয়ে, জল খেলাম ওই গাভীমুখ থেকে। এখানকার একবিন্দু জলেও মোক্ষলাভের গুণ। পাণ্ডবদের কষ্টার্জিত মোক্ষ এখন সহজেই হাতের মুঠোয়। তবে তীর্থযাত্রা পূর্ণ করতে আরও দু’কিলোমিটার মতো উঠতে হবে। ঘাসের সবুজ গালচের ওপর রঙিন ঘাসফুলের নকশাপেছনে ক্রমেই ছোট হয়ে আসে মদমহেশ্বর উপত্যকা। ওপরে সবুজ এক ঢেউ খেলানো মাঠ। চারদিকে তুষার-রাজ্য। গোটা চারেক ডোবা। বৃষ্টির জল জমলেই আয়না। তাতে মুখ দেখে চৌখাম্বা।মাঝখানে বুড়াবাবার পাথুরে আস্তানায় একটা বেল আর দশ টাকা রাখা। সেসব ছুঁয়েও দেখেননি বৃদ্ধ ভগবান। স্থায়ী বিগ্রহ। বয়সের ভারে চলতে অক্ষম। তাই মদমহেশ্বর নেমে গেলেও বরফ-রাজ্যে একা তিনি। সব দেখেশুনে রাখেন অভিমানী মুখে। অবশ্য তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে কেদারনাথ, সুমেরু, মান্দানি, চৌখাম্বা, নীলকণ্ঠ, কামেট, ত্রিশূলের মতো সেলেব্রিটি হিমালের দল। এখানে দাঁড়ালে ধুয়ে যায় সব সংকোচ, মুছে যায় সব গ্লানি।   

গোধূলির লাল আলোয় অনন্য দৃশ্য। নীল বুরাঁসের বনে কীসের যেন শব্দ। সন্ধের আগেই নেমে আসতে হবে বলে ফেরার পথ ধরলাম। নির্ভীকদের পথ গেছে অনেক দূর। মদমহেশ্বর মন্দিরের পিছনের পথ ধরে কাঁচনি খাল, পাণ্ডুসেরা, নন্দীকুণ্ড, মনপাই বুগিয়াল, বংশীনারায়ণ হয়ে হেলং। কাঁচনি খাল থেকে কাঁচনি তাল পেরিয়ে সুরাজ সরোবর হয়ে পানপাতিয়া কল। ভৈরবনাথের পুজো করতে তুলা সিং রোজ আসতেন এই কাঁচনি খালের পথেএদিকেই সেই পুরাণ-পথ। তিব্বত থেকে যে পথে এসে এক গাভী রোজ দুধ ঢেলে যেত মদমহেশ্বরের শিবলিঙ্গে। অথচ অন্য সময় দুধ দিত না বলে একদিন মালিক তার পিছু নিল। কীর্তি দেখে অগ্নিশর্মা হয়ে যেই না লাঠির আঘাত করেছে অমনি সে সরে গেছে। আর শিবলিঙ্গ ফেটে গেছে মাঝ বরাবর। সেই থেকে গৌণ্ডারের সব গোরু ছেড়ে দেওয়া হত ডোলি-যাত্রার সময়, বলছিলেন রমেশজি। একমাত্র দুধেল গাভীগুলোই যেত শেষ পর্যন্ত! বলল, অনীশ। তার মুখে এ গল্প খানিক বদলেও গেল।

গৌণ্ডার

মন্দির চত্বরে জ্বলছে সৌর আলো। পুলিশের সতর্কবার্তা, কাল সূর্যোদয়ের আগে নেমে যেতে হবে সবাইকে। পেছন ফিরে তাকানো যাবে না আর। ভরতজি বললেন, একবার শীতে মন্দিরে চুরি হওয়ায় কড়াকড়ি বেড়ে গেছে। মন্দির কমিটির দু’জন থাকবেন। মদমহেশ্বরের ব্যবহারের সব জিনিস তাঁরা বের করে রাখবেন চাতালে। ডোলি এসে থামবে কিছুটা দূরে। বেজে উঠবে শাঁখ। উঠে আসবেন ভগবান। ফুলে সাজানো মন্দিরের কপাট খুলবে।

সে সময়ে থাকতে পারব না। সময়ের শাসন। দর্শন জুটল না বিগ্রহের। দেখা হল না সন্ধ্যারতি। জ্বালা হল না দীপ। তবু ভেতরে তাঁর অস্তিত্বের আশ্বাস শান্তি দিল। 

মনে পড়ল তুঙ্গনাথের রাওয়াতজির কথা। শীতের তুঙ্গনাথ দেখতে যাচ্ছি। মন্দির বন্ধ। ওঁর সঙ্গে দেখা হল মক্কুমঠে। বলেছিলেন, যিতনা ভি কোশিশ করো, কুছ তো ছুটেগা। বলেছিলাম, যা পাচ্ছি তাই বা কম কী।  

সূর্যোদয়ের আগেই নামতে শুরু করলাম। পথেই উর্দিধারীদের অস্থায়ী সংসার। উঠে আসছেন গ্রামের মানুষ, সাধু-সন্ন্যাসীরা। কাঁসর বাজছে। আগেপিছে ভক্তের দল। একজনের হাতে প্রণামীর থালা। সাদা ধুতিতে দুই পতাকা বাহক। বাকিরা গেরুয়ায়। শক্ত কাঁধে ধ্বজা আর ত্রিশূল বইছে দু’জন। দু’জন তল্পিবাহক। দুই পুরুতের কাঁধে চেপে উঠছে ডোলি। রূপোর ডোলির মাথায় রূপোর ছাতা। লাল-হলুদ কাপড়ে ঢাকা বিগ্রহ। পিছনে জব্বর সাজে ঘোড়ায় চড়ে প্রধান পুরোহিত। আর সিনেমার  মতোই সব শেষে পুলিশ। শেষের দু’জন ছাড়া সবার খালি পা। ভক্তির শক্তি!

ডোলি চড়ে মদমহেশ্বর

মইখাম্বার বাঁধানো বেঞ্চে নামল ডোলি। ঘোড়া থেকে কোলে চড়ে নামলেন প্রধান পুরুত। তফাতে বসে গাঁজায় টান দিচ্ছিলেন কুনচট্টির সেই মহেশ্বরজিইশারায় ডাকলেন। উৎসবের মওকায় পাব্বনি উশুলের মতলব না কি? হঠাৎ ‘জুতা জুতা’ চিৎকারে ঘাবড়ে গেলাম। ভক্তিভাবে জ্ঞানশূন্য হয়ে এক পরম ভক্ত জুতো পরেই ছুঁয়ে ফেলেছেন ডোলি। সঙ্গে সঙ্গে সব অশুদ্ধ। এমনকি স্বয়ং মদমহেশ্বরও। মন্ত্রপাঠ শুরু হল। আর অমনি চারদিকে আবার শুদ্ধ ভাব। পাপের বোঝা নামায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বেচারা ভক্ত। 

বেশ জোরে হেসে উঠলেন মহেশ্বরজিবললেন, অন্দর শুধ, তো বাহার শুধ। ভিড়ের ভেতর এক নবদম্পতিকে দেখিয়ে বললেন, তখন মহাদেব সবে বিয়ে করেছেন। মধুচন্দ্রিমা করতে এলেন এই উপত্যকায়। চৌখাম্বার পায়ের কাছে। নির্জন পর্বতে পার্বতী প্রেমে মাতাল হলেন। সবাই বলল, মত্ত মহেশ্বর। সেই থেকে মদমহেশ্বর। দীপ্তবাবু কখন এসে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, উত্তর পেলেন তাহলে। আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, এর সঙ্গে কিছু জুড়ে অনীশকে দেবেন। ওর একটা ভায়োলিন কেনার শখ।   

ডোলি চলল। এত টাল খাচ্ছে যেন পড়ে যাবে। মুহুর্মুহু প্রণাম করছে সবাই। মহেশ্বরজি বললেন, বাবা, খুশি মে পিয়ে হুয়ে। গাঁজায় লম্বা টান দিয়ে বললেন, ভেতরে তাকিয়ে দ্যাখো, এ ভ্রমণে তুমিও খুশিতে মাতাল। বাইরের মত্ততা কমলে ভেতরের রহস্যে মন দাও। সেখানে শুধুই আনন্দম হি আনন্দম। এই সদানন্দই মহেশ্বর। তাকে পেতে হলে জাতের মাতাল হতে হয়। তখন ভেতর-বাইরে, তুমি-আমি সবই মহেশ্বর। 

মাথার ওপর দুলে উঠল জাকারান্ডা। 

 

 

       

 

২ Comments
  1. Prantik Biswas says

    সুন্দর লেখা, সুন্দর সব ছবি। আফসোস হল কেন এখনও যাইনি…

  2. বিদ্যুৎ দে says

    ভারি ভালোলাগায় ভরে উঠল মন। এত কিছুর এমন সমসত্ত্ব মিশ্রণ বিরল।

মতামত জানান

Your email address will not be published.