বা়ংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সাহিত্য পত্রিকা

উলূপী

পুত্র ইরাবানের মুখের দিকে যখনই তিনি তাকিয়েছেন, দেখেছেন পিতার শৌর্য, বীরত্ব। আবার মায়ের ভালবাসাও ইরাবানের সুগঠিত দৃঢ় শরীরে এক কোমল মায়া বিস্তার করেছে। ইরাবানের মধ্যেই তিনি অর্জুন আর উলূপী দু’জনকেই দেখতে পান।

রিমি মুৎসুদ্দি

 

অলকানন্দা আর ভাগীরথীর সঙ্গমতীরে নাগনন্দিনী উলূপী। জাহ্নবীর শীতল হাওয়ায় তাঁর বসন, কেশবন্ধন এলোমেলো। যতদূর দৃষ্টি প্রসারিত ততদূর তিনি দেখার চেষ্টা করছেন। ওই তো দূর হতে আরও দূরে মিলিয়ে যাচ্ছেন ওঁরা ছ’জন। পঞ্চপাণ্ডব আর দ্রৌপদী।
উলূপী এতক্ষণ ছিলেন স্থির নিশ্চল। ওঁরা দৃষ্টিপথের আড়াল হতেই উলূপীর অন্তর থেকে কে যেন বলে উঠল, নেই! অর্জুন নেই!

***

আরও বহুবছর আগে কৌরব্যনন্দিনী উলূপী এমনই এক হিমেল রাতে জাহ্নবী তীরে বসে ছিলেন। অন্তরে তাঁর প্রবল প্রদাহ, শোকের দাবানল। তিনি খুব সচেতন ছিলেন সেদিন। একবিন্দু অশ্রুকণাও যদি তাঁর ওই রক্তিম চোখের ভেতর থেকে বের হয় তাহলে যে অর্জুনের অমঙ্গল।
অর্জুন! উলূপীর জীবন-মরণ। তাঁর জীবনের একমাত্র ভালবাসা। আরও বহুযুগ আগে এই গঙ্গাপ্রান্তেই হোমকুণ্ড জ্বেলে স্বস্ত্যয়নরত অর্জুনকে প্রথম দেখেছিলেন তিনি। তার পর কত রাত্রি-দিবস বৎসর-মাস দিকচক্রবাল ধরে কেবলই পরিক্রমণ।
বিবাহ বাসররাত্রির স্মৃতিটুকুই সম্বল তাঁর। তবুও অর্জুন আছেন। এই চরাচরের সেই বীর তৃতীয় পাণ্ডব তাঁর শৌর্যে, বীর্যে, যশে, বন্দির বন্দনায় সমগ্র ভারতভূমি জুড়ে ব্যাপ্ত। এটুকুই উলূপীর সান্ত্বনা। আবার প্রাপ্তিও।
সমস্ত জীবন ধরে অর্জুন বিহনেও কেবলমাত্র তাঁকে মনে করে ও তাঁর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন উলূপী। প্রমাণ করেছেন, ভালবাসা নামক শব্দের গায়ে তামসিক কামনার আগুন যেমন জ্বলে, ঠিক তেমনই সে কামনার অন্তরে চির প্রজ্জ্বলিত এক শাশ্বত পবিত্র সত্তা। এই দুই সত্তার মিলনচিহ্ন উলূপী তাঁর শরীরে ধারণ করেছেন। পুত্র ইরাবানের মুখের দিকে যখনই তিনি তাকিয়েছেন, দেখেছেন পিতার শৌর্য, বীরত্ব। আবার মায়ের ভালবাসাও ইরাবানের সুগঠিত দৃঢ় শরীরে এক কোমল মায়া বিস্তার করেছে। ইরাবানের মধ্যেই তিনি অর্জুন আর উলূপী দু’জনকেই দেখতে পান।
সেই যে বিবাহরাত্রের পর তিনি নিজে অর্জুনকে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছেন তাঁর স্বস্থানে, তার পর থেকেই অর্জুনের সন্তানকে দশ মাস দশ দিন নিজের গর্ভে প্রতিপালন করা থেকে তাকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত রক্ষা করা ও পিতার উপযোগী করে গড়ে তোলার মধ্যে সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা, প্রবল প্রতিবন্ধকতা সবই তিনি একা সহ্য করেছেন এতদিন।
উলূপীর প্রথম স্বামী সুপর্ণ শত্রুপক্ষের হাতে নিহত হওয়ার পর থেকেই সুপর্ণর ভাই অশ্বসেনের দৃষ্টি ছিল তাঁর ওপর। শুধু কি অশ্বসেন? সর্পবিদ্যাবিশারদ নাগজাতির আরও পুরুষরাও তো তার শরীরের পিপাসী ছিল। গহীন বনে তিনি যখন একা বিচরণ করতেন, সমস্ত শরীরে তীব্র জ্বালা নিয়ে এক গভীর বিষাদে তাঁর দিন কাটত। নাগিনীর শরীরে কাঁঠালিচাঁপা ফুলের সুবাস পেলে যেমন নাগকুল তীব্র কামনায় জর্জরিত হয়ে ছুটে আসে, উলূপীর তরঙ্গায়িত শরীরের টানে নাগজাতির পুরুষরাও ছুটে এসেছে বহুবার। দেবর অশ্বসেন সেই পুরুষদের মধ্যে অন্যতম। উলূপী আহত সর্পিণীর ন্যায় উদ্যত ফণার ঔদ্ধত্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন সকলকে। তিনি জানতেন না কে তাঁর এই কামরতি বিষাদের নিবারণ করবে?
কেবল মহাকালের কবিতায় লেখা ছিল উলূপীর বিধিলিপি।
গঙ্গাদ্বারে অর্জুনকে দেখে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। জলপরীর মতো অর্জুনকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর পিত্রালয়ে।
ধৈর্য তিনি হারাননি কখনও। অপেক্ষা করেছেন। স্নানান্তে অর্জুনের পূজাবিধি উপচার সহযোগে সম্পন্ন করা পর্যন্ত। নিজেই সেই আয়োজনও করেছেন। অন্তরে যাঁকে কামনায় গ্রহণ করেছেন, তাঁর ধর্মাচরণের আয়োজন সুসম্পন্ন করে তিনি যে প্রিয়র ধর্মপত্নীর ন্যায় কাজ করেছেন। এসবই কি সেই মহাকবির কলমে লেখা উলূপীর অমোঘ আলেখ্য?

আসন্ন দক্ষিণায়ণের এই রাত্রিকালে উলূপীর অন্তরে মাতৃশোক! এও বুঝি সেই মহাকবির আখ্যান অংশ!
কুরুক্ষেত্র থেকে নাগরাজ্যে আজ বার্তা এসেছে। নাগরাজ্যের যুবরাজ, উলূপী-অর্জুন পুত্র ইরাবান কুরু-পাণ্ডব সমরে নিহত। ইরাবানের বীরত্বগাথাও শুনেছেন তিনি। প্রবল যুদ্ধে ইরাবান কী প্রবল পরাক্রমে ধ্বংস করেছে কৌরব বাহিনীর বীর সৈন্যদের। তার সুকৌশলী অস্ত্রে একে একে ঘায়েল হয়েছে শকুনির ছয় ভ্রাতা। মধ্যম পাণ্ডব হিড়িম্বা-ভীমপুত্র বীর ঘটোৎকচের সঙ্গে উলূপীপুত্র ইরাবানও শত্রু সৈন্যের ত্রাস ছিল।
অলম্বুষ রাক্ষসের মায়াবী অস্ত্রে ইরাবানের শরীর ছিন্নভিন্ন হওয়ার কথাটুকু তাঁর কানে আসতেই তিনি ছুটে পালিয়ে এসেছেন সেই শোকসভা থেকে অনেক দূরে। দৌহিত্র শোকে নাগরাজ আকুল। সমস্ত নাগজাতিও তাঁর পিতার মতো তাঁকেই ইরাবান হত্যার জন্য দায়ী করছে। এমনকি রাজ্যে আজ এও উচ্চারিত হচ্ছে— মণিপুরের রাজমাতা চিত্রাঙ্গদা তো বভ্রুবাহনকে পাঠাননি এই অসম যুদ্ধে! কেবল উলূপীই নাগরাজ্যের এই বীরপুত্রকে কুরক্ষেত্র যুদ্ধে বলি দিলেন? স্বামীর ভালবাসা পেতে কাঙালিনী উলূপী আত্মজের বলিদান দিলেন?
চারদিক থেকে ছিছিক্কার উলূপীর কানে আসছে। তবুও তিনি বিচলিত হননি। অর্জুনকে বিবাহ করার জন্যও তাঁকে সইতে হয়েছে কলঙ্ক, লাঞ্ছনা। স্বজাতিতে কেন তিনি স্বামী নির্বাচন করলেন না? সমাজের প্রথা অনুযায়ী বিধবা বধূর ক্ষেত্রে সন্তান উৎপাদন করার অধিকার তার দেবর অথবা ভাশুরের। উলূপী তাঁর স্বভাবজাত দৃঢ়তায় সে নিয়ম ভেঙেছেন।
অর্জুনকে স্ব-ইচ্ছায় তিনি পতিত্বে বরণ করেছেন। কেবল একটি রাতের জন্যই অর্জুনের শয্যাসঙ্গিনী হবে জেনেও তাঁর স্ত্রী হয়েছেন। ব্রহ্মচর্যের বিষাদ থেকে তিনি যেন এক জলদেবীর মতো অর্জুনকে হাত ধরে তীরে এনে দাঁড় করিয়েছেন। অর্জুনের জীবন নানা বর্ণে, নানা রঙে ও বহু মানুষে বর্ণিল। অর্জুন পেয়েছেন তাঁর জীবন-কান্ডারি সখা কৃষ্ণকে। উলূপীর সম্বল অর্জুনের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ প্রেম।
ইরাবানের মৃত্যুতে সেই প্রেমও আজ ধিক্কার শুনছে।
অর্জুনের কাছে যাওয়ার এ কি ছল উলূপীর? আপন পুত্রকে সমরশয্যায় সাজাতে গিয়ে কি একটুও প্রাণ কাঁপেনি এই নিষ্ঠুর মায়ের? কেবল অর্জুনের কাছে পত্নীত্বের স্বীকৃতিটুকুই বড়? অর্জুন-প্রেমের পরীক্ষায় সফল হতে কুরুক্ষেত্রের রণভূমিকে তিনি বেছে নিলেন? ইরাবানের চিতাভষ্ম আজ তার মাকে স্বামীপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছে।
এমন সব তীর্যক বাক্যভেদী আঘাত উলূপীর মাতৃশোকতপ্ত হৃদয়ের মর্মে শেলের মতো বিঁধছে। জাহ্নবীর জলের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রার্থনা করছেন, “মা গঙ্গা, আমাকে শক্তি দাও। আমার ভেতরের অশ্রুনদী যেন এ ধরাতলে একবিন্দুও না পতিত হয়। আমার স্বামী অর্জুনকে রক্ষা করো। কোনও অমঙ্গল, অকল্যাণ যেন এই প্রবল সমরে তাঁকে স্পর্শ না করতে পারে।”
গঙ্গার ঢেউ হঠাৎ উত্তাল। যেন উলূপীর এই প্রার্থনার বিরুদ্ধে জাহ্নবীর তীব্র পরিহাস! একদৃষ্টে সেই উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে উলূপী টের পেলেন জাহ্নবীর শোকোচ্ছ্বাস। তাঁর মাতৃহৃদয়ের মতো মা গঙ্গাও কি আজ পুত্রশোকে আচ্ছন্ন? ইরাবানের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরের সঙ্গে অর্জুনের বীরত্বের বার্তাও বহন করে এনেছে দূত। কেমন করে অর্জুন অজস্র শরবিদ্ধ করে ভূপতিত করেছেন কুরুকূল গৌরব পরমবীর ভীষ্মকে। সমগ্র পৃথিবীর যোদ্ধাদের দ্বারা অজেয় মহারথী, মহাবীর, ভারতকুলতিলক ভীষ্মের পতনের গৌরব স্পর্শ করেছে অর্জুনের গাণ্ডিব।
সেই বিজন গঙ্গাদ্বারে উলূপী অকস্মাৎ শুনতে পেলেন, কারা যেন মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করল তিনি। এই ঘোর আঁধার রজনীতে সমবেত পুরুষ কণ্ঠে ও কী মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে?
না। মন্ত্রের মতো শোনালেও এ তো বিলাপ। ক্রমশ শব্দসমূহ বেশ নিকটে আসছে। এই আঁধার রাতে কারা আসছেন ভাগীরথী তীরে বিলাপমন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে?
উলূপীর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তাঁর ভেতরের সমস্ত হাহাকার থেকে উচ্চারিত হল, “অর্জুন! অর্জুন! স্বামী!”
এ কী! পুরুষ কণ্ঠ থেকেও নির্গত হচ্ছে সেই একই নাম— “অর্জুন! অর্জুন!”
এ কী শুনছেন তিনি? চরাচর জুড়ে উলূপীর অন্তরের প্রতিধ্বনি?
ভাগীরথী তীরে এখন তিনি একা নন। নিকটেই ওই সাতজন পুরুষ কী করুণ স্বরে বিলাপ করছেন। ওই তো, ওঁরা সাতজন নেমে গেলেন ভাগীরথীর উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে। এ কী! ওঁরা কি আত্মহনন করবেন? এমন উত্তাল জলধারার মধ্যে আজ এই রাতে সাতজন অচেনা পুরুষ ‘অর্জুন অর্জুন’ শব্দে কী এক বিলাপধ্বনি তুলে ভেসে যাচ্ছেন!
কোনও এক অজানা অমঙ্গলের আশঙ্কায় উলূপী শঙ্কিত। কিন্তু ভীত নন তিনি। অর্জুনের মঙ্গলের চেয়ে তাঁর প্রাণ দামি হতে পারে না। তিনিও ঝাঁপ দিলেন উত্তাল জলরাশির মধ্যে। প্রবল প্রাণশক্তিতে তিনি চেষ্টা করছেন ওই বিলাপরত পুরুষদের সম্মুখে যেতে। ক্রমশ ওই সাতজন যেন মিলিয়ে যাচ্ছেন ভাগীরথীর অতলে।
উলূপী বুঝতে পারলেন না এই দিব্যকান্ত পুরুষগণ কেন তাঁর স্বামীর নাম উচ্চারণ করতে করতে আত্মহনন করছেন? তিনি একা কি এই সাতজনকে উদ্ধার করতে পারবেন? তিনি কি জানতে পারবেন কেন এইসব অশ্রুসজল কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে অর্জুনের নাম?

মা গঙ্গার কাছে প্রবল প্রার্থনা জানিয়ে তিনি দ্রুত সন্তরণ করলেন। ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনও তিনি পিছিয়ে যাচ্ছেন অনেক দূর। নাকে-মুখে জল এসে নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আবার পরক্ষণেই ঢেউ নিজেই তাঁকে এগিয়ে দিচ্ছে। এভাবেই চলতে চলতে সেই সাতজন দিব্য পুরুষের কাছে এসে গেলেন তিনি। তাঁদের বিলাপধ্বনি তখনও সমস্ত চরাচর জুড়ে। উলূপী করজোড়ে আকুল প্রার্থনা জানালেন। তাঁরা যদি দয়া করে জানান কেন তাঁরা আজ এইভাবে বিলাপ করছেন? কেন তাঁদের বিলাপে উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর স্বামীর নাম?
প্রায় গলা পর্যন্ত জাহ্নবীর জলে ডুবে যাচ্ছেন তাঁরা। নিজেদের রক্ষা করার কোনও তাগিদই তাঁদের নেই। কেবল ভাগীরথীর কোলে আশ্রয় নিতেই যেন এই অবগাহন।
উলূপীর প্রশ্নের জবাব এল— “আমরা ভাগীরথীপুত্র সপ্তবসু। আমাদের ভ্রাতা ভীষ্মকে অর্জুন আজ নিষ্ঠুরভাবে, অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে। শিখণ্ডী নামে এক দুর্বল বালকের আড়ালে নিরস্ত্র ভীষ্মের ওপর ভীষণ ভয়ংকর শরবর্ষণ করে তাঁকে হত্যা করেছে অর্জুন! ওই দ্যাখো! মাতা ভাগীরথী আজ কী প্রবল ক্রন্দনরত! আমাদের অভিশাপ বর্ষিত হল অর্জুনের ওপর। এই অন্যায়ের শাস্তি মৃত্যু! মৃত্যু! মৃত্যু!”
জল-স্থল-আকাশ-বাতাস আলোড়িত হয়ে উচ্চারিত হল— মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু! অর্জুনের মৃত্যু!
উলূপী সইতে পারলেন না সেই অভিশাপবাক্য। তিনি মূর্ছা গেলেন!

***

আকাশে তখনও নক্ষত্র সমাহার। অকস্মাৎ এক বিরাট কালো মেঘ এসে ঢেকে দিল সমস্ত নক্ষত্রসমাবেশ। কঠিন-কঠোর বজ্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন আকাশের শরীর। যেন মেঘ এসে নামবে ভাগীরথীর বুকে।
উলূপীর জ্ঞান ফিরেছে। আকাশের দিকে তাকিয়েও তিনি জাহ্নবীর ছায়া দেখতে পেলেন। মেঘমণ্ডল জুড়ে ছড়ানো তার ঘনঘোর কৃষ্ণবর্ণ কেশরাশি। জটাজুটধারী পিনাকপাণিও কি কাছেই আছেন?
উলূপী নদীর দিকে তাকালেন। ক্রোধ ও ঘৃণাভরে তিনি স্বগতোক্তি করলেন, আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম? কে অভিশাপ দিল অর্জুনকে? কার এত দুঃসাহস?
আকাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠতে উলূপী আরও সাহসী হলেন। ইন্দ্রের বজ্রের মতো শক্তিশালী অর্জুনের গাণ্ডিব। ইন্দ্রতুল্য তাঁর স্বামী দেব, দানব, নর সকলের দ্বারাই অজেয়। সাহস আর ক্রোধের মিশ্রণ উলূপীর সুললিত মুখমণ্ডলে। বিজন সেই গঙ্গাদ্বারে তিনি নিজেকেই বললেন, পতিপ্রাণা উলূপীর জীবদ্দশায় অর্জুনের কোনও অনিষ্ট হতে পারে না।
তার পর ভাগীরথীর নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে বললেন, “গঙ্গা, তুমি তো পতিপ্রাণা সতী নারী নও। বিধাতার পুজোয় ভোগ রন্ধনকার্যে মহাদেব তোমাকে এক দিবসের জন্য নিয়ে এসেছিলেন দেবলোকে। তোমার স্বামী বলেছিলেন, সন্ধের আগে ঘরে ফিরতে। উৎসবে মেতে উঠে তুমি রাত্রি পার করে দিলে। আর স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েও তোমার সে কী তেজ! পিনাকপাণিকে বললে, যে স্বামী স্ত্রীকে সন্দেহ করে তাঁর ঘরে তুমি ফিরতে চাও না। স্ত্রীজাতি যে সময় অসহায়তা অনুভব করে তুমি সেই সময় উগ্রচণ্ডা। ডমরুধর মহাদেব মুগ্ধ হলেন তোমার সেই রূপে। তাছাড়া, যতই তুমি উগ্র হও, তোমার তো কোনও আশ্রয় ছিল না তখন। তাই দেবাদিদেব তোমায় তার মস্তকে ধারণ করলেন। তার পরও তুমি আরেক পরপুরুষ শান্তনুর অঙ্কশায়িনী হলে? কেবল বসুগণকে মুক্ত করবে বলে?”
উলূপীর ক্রোধ প্রশমিত হয়নি। সমস্ত চোখের তারায় যেন তিনি ধরে রেখেছেন ওই আকাশের বিদ্যুৎচমক। তীব্র নিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হল তাঁর কথা।
“মা জাহ্নবী, তুমি আমাকে অভিশাপ দিয়ো না। তুমি কখনও তোমার স্বামীকে এমন করে ভালবাসতে পারনি। সমগ্র বিশ্ব সংসারে এমন করে ভালবাসতে কে পেরেছে মাতা? উলূপীর জগৎ সেই জন্মলগ্ন থেকেই শূন্য, রিক্ত। আমি জন্মাতেই আমার মা, নাগকুলরমণী মারা গেলেন। বিবাহ হতেই স্বামী নিহত হলেন। আর ভালবেসে যাকে পতিত্বে বরণ করলাম, মাত্র একবারই ইহজীবনে তাঁর স্পর্শ পেয়েছি। তবুও তিনি রয়েছেন। উলূপীর সমস্ত অন্তর জুড়ে, সমস্ত সত্তায় কেবল তিনিই আছেন। পিতা, সন্তান কেউই তো তাঁর মতো আপন নন আমার। আমার শূন্য কোল কেবলই আমাকে বলছে, এই হয়তো শুনব পুত্র ইরাবান আমাকে ডাকবে, মা, কোথায় তুমি?”
দু’হাতে মুখ ঢাকেন উলূপী।
“না। আর কোনওদিন শুনব না সেই ডাক। তবুও আমি বেঁচে আছি। বেঁচে থাকব। আমি বেঁচে থাকতে ইরাবানের পিতা অর্জুনকে মৃত্যু স্পর্শ করতে পারবে না। যে পিতার গৌরবের জন্য, সুরক্ষার জন্য আমার সন্তান প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, আমি তার সেই পিতাকে রক্ষা করব।
ধীর, মন্থর গতিতে উলূপী এবার গঙ্গাতীর থেকে প্রস্থান করলেন।

***

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ। কৌরবপক্ষে আর একজন বীরও অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধিষ্ঠির হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসনে আসীন। তিনি সমগ্র ভারত ভূখণ্ডের সম্রাট হবেন। তাই রাজ্যে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন। যজ্ঞের অশ্ব নিয়ে অর্জুন নানা দেশ পরিভ্রমণ করে সেই রাজাদের যুধিষ্ঠিরের বশ্যতা স্বীকার করিয়ে যজ্ঞে আমন্ত্রণ জানাতে বেরিয়ে পড়েছেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কেবল কৌরব বীর নয়, এ ভারতভূমির প্রায় সব বীর যোদ্ধাই নিহত অথবা পাণ্ডবদের মিত্রে পরিণত। তাই অর্জুনের যজ্ঞাশ্বকে কেউই বাধা দেননি। এ পর্যন্ত যেসব রাজ্যে অর্জুন গিয়েছেন, সবাই যুধিষ্ঠিরের বশ্যতা স্বীকার করেছেন। সম্রাট যুধিষ্ঠিরের উদ্দেশে দেওয়া নানা উপঢৌকন সংগ্রহ করে অর্জুন আরও উত্তর-পূর্বে এগিয়ে চলেছেন। যজ্ঞাশ্ব এসে থামল মণিপুর রাজ্যে।

মণিপুর রাজা বভ্রুবাহন সংবাদ পেলেন তাঁর রাজ্যে পা রেখেছেন মহাবীর অর্জুন। রাজা বভ্রুবাহনের কাছে অর্জুন কেবল মহাবীর তৃতীয় পাণ্ডব নন। তিনি জানেন, অর্জুন তাঁর পিতা। অন্দরমহলে মা চিত্রাঙ্গদা আজও তাঁর পিতার কথা বলতে বলতে অশ্রুসজল হয়ে ওঠেন। এ জীবনে মা ও ছেলে কখনও অর্জুনের সাক্ষাৎ পাবেন এমন আশা করেননি। অথচ এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন মা অর্জুনের বীরগাথা বভ্রুবাহনের কাছে বলেননি। মায়ের অন্তরের বিরহ বভ্রুবাহনকেও স্পর্শ করে। তিনি নিজেও একবার পিতাকে চোখের দেখা দেখতে চেয়ে আকুল ছিলেন। তবে বিনা আমন্ত্রণে পিতার দর্শনের জন্য গেলে তা সমস্ত মণিপুর রাজ্যের অপমানের কারণ হবে, তাই এতদিন রাজা সয়েছেন পিতৃ-বিচ্ছেদ যন্ত্রণা।
রাজপুরের অন্দরে পিতার আগমনবার্তা জানিয়ে বভ্রুবাহন নানাবিধ উপহার ও অর্ঘ্যাদি নিয়ে সুসজ্জিত রথে পিতার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। তিনি কেবল যজ্ঞাশ্বই ফিরিয়ে দিলেন না, বহুমূল্য রত্নাদি দিয়ে পিতার পাদবন্দনা করলেন। প্রাণভরে তিনি এইবার পিতৃপূজা করবেন।
কিন্তু এ কী! অর্জুন ক্রুদ্ধ। পদাঘাতে তিনি ফিরিয়ে দিলেন সমস্ত রত্নরাশি। বললেন, “কে আমার পুত্র? আমার পুত্র বীর অভিমুন্য। যে চক্রবূহ্য ভেদ করে একা বীরের মতো যুদ্ধ করে সপ্তরথীকে পরাজিত করেছিল। তার পর অন্যায়, অসম যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিল। আমার পুত্র ইরাবান। যে কৌরব বীরদের ত্রাস ছিল সমরভূমিতে। আমি বীর যোদ্ধাদের পিতা। আমি ক্ষত্রকুলে কলঙ্কিত কোনও ভীরু কাপুরুষের পিতা নই। তুমি ক্ষাত্রধর্ম ত্যাগ করে আমাকে যজ্ঞাশ্ব ফিরিয়ে দিলে? আমার সঙ্গে যুদ্ধ না করে আমার পাদবন্দনা করছ?”
বভ্রুবাহন স্তব্ধ! তিনি এসেছিলেন পিতাকে রাজপুরে আমন্ত্রণ জানাতে। যেখানে তার মাতা অর্জুন-পত্নী চিত্রাঙ্গদা ফুলের শয্যায় অর্জুনের শয্যা নির্মাণ করেছেন। হয়তো সেই অভাগিনী বিরহিনী আজ স্বহস্তে পাক করেছেন নানাবিধ সুখাদ্য। স্বামী সেবার তৃষ্ণা বুকে নিয়ে তার মা আকুল নয়নে চেয়ে আছেন উন্মুক্ত বাতায়নে। পথপ্রান্তে কোনও হ্রেষাধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেই হয়তো মা ভাবছেন, এই বুঝি পিতাকে নিয়ে ফিরল বীর পুত্র!
বভ্রুবাহনের দু’চোখ বেয়ে বারিধারা। এমন সময় কে এক অতিসুন্দর রমণী যেন পাতাল ফুঁড়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। রমণী বললেন, “পুত্র বভ্রুবাহন। আমি তোমার মাতা উলূপী। কৌরব্যরাজের দুহিতা, ইরাবান-মাতা উলূপী।”
“ইরাবান-মাতা?”
পিতার মুখে তিনি শুনেছেন বীর ইরাবানের কথা। কুরুপাণ্ডব যুদ্ধে নিহত ইরাবান। অভিমন্যুর মতো সেও পিতার প্রিয়।
“হ্যাঁ বৎস।”
বভ্রুবাহন অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, “আপনি আমারও মাতা।”
উলূপী যেন এই কথা শোনার অপেক্ষাতেই ছিলেন। “মা বলে যখন ডেকেছ, আমার কথা মন দিয়ে শোনো। সর্বশক্তি দিয়ে তুমি তোমার পিতার সঙ্গে যুদ্ধ করো।  ইরাবান, অভিমন্যুর মৃত্যুর পরও এ ভারতভূমি বীর সন্তান শূন্য হয়নি। তোমার পিতাকে তুমি বুঝিয়ে দাও বৎস। এই আমার অনুরোধ। যাও। এগিয়ে যাও। যুদ্ধ করো।”
যুদ্ধ যুদ্ধ!
বভ্রুবাহনের কানে সে কথা অনুরণিত হল। রণনিনাদে তিনি আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুললেন। বীর অর্জুন একটু হাসলেন। সঙ্গী কর্ণপুত্র বৃষকেতুকে পাঠালেন যুদ্ধক্ষেত্রে। অর্জুনের আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানল তাঁর আত্মজ। বৃষকেতু যুদ্ধে নিহত হলে অর্জুন নিজে যুদ্ধেক্ষেত্রে পুত্রের মুখোমুখি হলেন। বভ্রুবাহনের কানে বাজছে উলূপী মাতার কথা। “যুদ্ধ যুদ্ধ! প্রমাণ করে দাও অর্জুনপুত্র বীর বভ্রুবাহন ভীরু নয়। তবেই পাবে পিতার স্নেহ। পিতার স্বীকৃতি।”
বভ্রুবাহন প্রবল বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন কুরু-সমর বিজয়ী অর্জুনের সঙ্গে। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর অর্জুন। হয়তো বা রণক্লান্ত অর্জুন। পারলেন না বভ্রুবাহনের প্রবল পরাক্রমী তিরের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে। যুদ্ধভূমিতে লুটিয়ে পড়লেন বিশালদেহী যশস্বী তৃতীয় কৌন্তেয়।
রাজভবন থেকে ছুটে এলেন রানি চিত্রাঙ্গদা। প্রবল শোকে রাজমাতা বিলাপ করলেন। নিজ পুত্রের প্রাণের বিনিময়েও তিনি তাঁর স্বামীকে জীবিত দেখতে চান। মাতার বিলাপ শুনে বভ্রুবাহন নিজের প্রাণত্যাগের সঙ্কল্প নিলেন।
ক্রন্দনরত সেই রণভূমিতে অর্জুনের রক্তাক্ত ভূলণ্ঠিত দেহ স্পর্শ করলেন উলূপী।
অর্জুন!
তাঁর প্রিয় অর্জুনের মস্তক পথের ধুলো থেকে সযত্নে তুলে নিজের ক্রোড়ে রাখলেন তিনি। চিত্রাঙ্গদা ও বভ্রুবাহনের ধিক্কার, চিৎকার, ক্রন্দন কিছুই উলূপী শুনতে পাচ্ছেন না। তাঁর আজানুলম্বিত ঘন কেশরাশির মধ্যে থেকে তিনি বের করলেন এক মহামূল্যবান রত্ন। সেই মণিরত্নটি পরম যত্নে, মমতায় উলূপী রাখলেন অর্জুনের বুকের ঠিক মাঝখানে। তার পর কী যেন বিড়বিড় করলেন। অর্জুন সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে চাইলেন।

ক্রন্দনরত চিত্রাঙ্গদা, বভ্রুবাহন ও অবিচল উলূপীকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন তিনি। ভাবলেন, ইরাবানের মৃত্যুশোকে কি উলূপী ক্রুদ্ধ?
উলূপী সমবেত সকলের প্রশ্নের উত্তর দিলেন। অন্যায়ভাবে ভীষ্মবধের কারণে দোষী অর্জুন। গঙ্গাতীরে বসুগণের অর্জুনকে অভিশাপ দেওয়ার কাহিনি তিনি সকলকে জানালেন। যুদ্ধে অজেয় অর্জুন কেবল নিজের কাছেই পরাজিত হতে পারেন। পুত্র স্ব-প্রতিকৃতি। তাই এই অভিশাপ খণ্ডনের জন্যই বভ্রুবাহনের সঙ্গে অর্জুনের যুদ্ধ ও তৎপরবর্তী এই পরিস্থিতি।
অর্জুন সেদিন বভ্রুবাহনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। মণিপুর রাজভবনে অর্জুনের জন্য নির্মিত ফুলশয্যাটি সেদিন শূন্যই ছিল। অর্জুন তাঁর কর্তব্য পালনের উদ্দেশ্যে যজ্ঞাশ্বের সঙ্গে সেদিনই মণিপুর ত্যাগ করে অন্য কোনও দেশের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। কেবল যাওয়ার আগে বভ্রুবাহনকে তার দুই মাতা সহযোগে রাজসূয় যজ্ঞে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

***

হস্তিনাপুরের মাতা কুন্তী, ভারতসম্রাজ্ঞী দ্রৌপদী ও অন্য রাজবধূরা উলূপী, চিত্রাঙ্গদাকে সসম্মানে অর্জুনের বধূরূপে বরণ করেছেন। সেই দিন থেকে পঞ্চপাণ্ডবের দ্রৌপদী-সহ মহাপ্রস্থানে যাওয়ার আগে পর্যন্ত উলূপীও চিত্রাঙ্গদার মতোই অর্জুনের ছায়াসঙ্গিনী ছিলেন। মহাপ্রস্থান আসন্ন হলে চিত্রাঙ্গদা অশ্রুনয়নে স্বামীকে বিদায় দিয়ে ফিরে গিয়েছেন তাঁর সন্তান বভ্রুবাহনের কাছে। উলূপী ফিরে কোথায় যাবেন? ভাগীরথী তীর পর্যন্ত তিনি অর্জুনকে অনুসরণ করেছেন। তার পর তাঁর যাওয়া নিষেধ। সে কেবল পঞ্চপাণ্ডব আর দ্রৌপদীর যাত্রাপথ।
ভাগীরথীর জলরাশি আজও ঘন কৃষ্ণবর্ণ। যেন অর্জুনের প্রাণপ্রিয় সখা কৃষ্ণ! উলূপী জানেন, অর্জুন সখা কৃষ্ণও আজ নেই।
মহাপ্রস্থানের পথে ওই যে মিলিয়ে গেলেন উলূপীর প্রাণাধিক প্রিয় অর্জুন। নাগনন্দিনীর সমস্ত জীবনের ভালবাসা, আশ্রয়!
না। এখনও উলূপীর আশ্রয় আছে এ ভূমিতে। ওই যে কৃষ্ণবর্ণ জলরাশি! সে নদী, না মাতা?উত্তরের খোঁজে উলূপী আশ্রয় নিলেন জাহ্নবীর বুকে।
মহাকালের সিন্দুকে আজও উলূপীর হৃদয়মালা কেবল অর্জুনের জন্যই পথ চেয়ে আছে।

অলঙ্করণ: রাজ রায়
মতামত জানান

Your email address will not be published.